নাসিক ৪নং ওয়ার্ডেরর উপ-নির্বাচনে হাসানের বিজয়ের নেপথ্যে

0
8

নারায়ণগঞ্জ (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ): বহুল আলোচিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৪নং ওয়ার্ডের উপ-নির্বাচনে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সাবেক ক্রিকেটার আরিফুল হক হাসান বিজয়ী হওয়ার নেপথ্যে নানা কারণ বেরিয়ে এসেছে। সেভেন মার্ডারের প্রধান আসামী নুর হোসেনের সহযোগি হওয়ার পরও হাসান কেন বিজয়ী হল? এ নিয়ে চলছে চুল চেরা বিশ্লেষন। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষনার পর থেকে হাসান সমর্থকদের মধ্যে বিজয়ের উচ্ছাস আনন্দ লক্ষ্য করা গেলেও পরাজিত নিকটতম দুই প্রার্থী আমীর ভান্ডারী ও নজরুল ইসলামের সমর্থকরা হতাশ। তবে ৪নং ওয়ার্ডবাসী হেভিওয়েট দুই প্রার্থীর পরাজয় এবং হাসানের বিজয়ের কারণগুলো সনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।
এদিকে নির্বাচনী ফলাফলের পোস্ট মর্টেম করতে গিয়ে হাসানের বিজয়ের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ বেরিয়ে এসেছে। এরমধ্যে জাতীয় শ্রমিকলীগের সভাপতি আবদুল মতিন মাস্টারের ক্লিন ইমেজ, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগ ও নুর হোসেনের সমর্থন, ২০ দলীয় জোটের বড় একটি অংশের সমর্থন, একজন শিক্ষিত ও ক্রিকেটপ্রেমী যুবক হিসেবে তরুনদের পছন্দের প্রার্থী হওয়ায় হাসানকে ভোটাররা বিজয়ী করেছে। এছাড়া নির্বাচনী প্রচারনা ও গনসংযোগের সময় সাধারন ভোটারদের সঙ্গে মিশে যাওয়া এবং ভোটারদের hasan-1দ্বারে দ্বারে গিয়ে হাস্যেজ্জল ভাবে একেবারে সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে ভোট প্রার্থনা করার বিষয়টি ভোটারদের মনে ধরেছে। হাসানের জীবনবৃত্তান্ত এবং ওয়ার্ডবাসীর সহযোগিতা নিয়ে একটি সুন্দর ও আধুনিক ওয়ার্ড হিসেবে ৪নং ওয়ার্ডকে গড়ে তুলতে হাসানের প্রদক্ষেপ সংবলিত লিফলেটটি সচেতন ভোটারদের নজ কেড়েছে।
এছাড়া ভোটারদের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করেছে, নুর হোসেনের সঙ্গে হাসানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু  নুর হোসেন কখনো হাসানকে কোন অপরাধ কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়ায়নি। এবং হাসান নিজেও কোন কোন টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, জবরদখল, মাদক ব্যবসা, হাট ইজারাসহ বিতর্কিত কোন কাজের সঙ্গে জড়িত হয়নি। এবং কেউ প্রমানও দিতে পারেনি। সেভেন মার্ডারের পর পরিস্থিতির কারণে ১৫ মাস এলাকা থেকে দুরে সরে থাকলেও তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ ওঠেনি। ফলে মনোনয়নপত্র দাখিলের পর নিজ বাড়িতে যখন হাসান যায় তখন বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে। শত শত এলাকাবাসী হাসানকে দেখতে আসে। যদি সে খারাপ হতো, তাহলে তাকে কাছে পেয়ে কেউ তার জন্য আবেগে আপ্লুত হয়ে চোখের পানি ফেলতো না। সেদিনের ওই দৃশ্য পুরো শিমরাইল গ্রামের সাধারণ মানুষের মনে দাগ কাটে।
তাছাড়া হাসানের বাবা আবদুল মতিন মাস্টারকে নুর হোসেন ‘স্যার’ বলে সম্মোধন করতো। ফলে একদিকে স্যারের ছেলে অন্যদিকে একজন শিক্ষিত যুবক, এই দুটি কারণে নুর হোসেন হাসানকে নিজের আপন ছোট ভাইয়ের মত আদর করতো এবং কাছে কাছে রাখতো।
হাসানের বিজয়ের আরেকটি কারণ হলো নুর হোসেন কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকার অনেক উন্নয়ন কাজ নুর হোসেন নিজের ব্যক্তিগত টাকা দিয়ে করে দিয়েছে। ফলে ভোটারদের একটি অংশের কাছে নুর হোসেনের ব্যাপক গ্রহনযোগত্যা ছিল। তারা নুর হোসেনের মেসেজ পেয়ে হাসানকে চোখ বন্ধ করে ভোট দিয়েছে।
অপরদিকে হাসানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দুই হেভিওয়েট প্রার্থী আমীর ভান্ডারী ও নজরুল ইসলামের অপকর্মের চিত্র ছিল মানুষের মুখে মুখে। যেমন আমীর ভান্ডারী গত ২০ বছর ধরে রাতভর মাদক সেবন করে। ভোর ৪টার দিকে ঘুমাতে যায়। আর ঘুম ভাঙ্গে দিনের ৪-৫টার দিকে। সারাক্ষন মাতাল অবস্থায় তাকে। জরুরী প্রয়োজনেরও মানুষ তাকে ফোন করে পায় না। মাদক ব্যবসা, পরিবহনে চাঁদাবাজি, চিটাগাংরোডের ফুটপাত দখলসহ নানা অপকর্মের হোতা সে। তার ভাই হাবিবুল্লাহ হবুলও একজন ভুমিদস্যু। নিরিহ মানুষের লাখ লাখ টাকার জমি দখল করেছেন। ফলে টাকার বস্তার নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ভোট চাইতে গিয়ে নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হবুল ভোটারদের বলেন, আপনারা আমীরকে না, মনে করেন আমাকে ভোট দিচ্ছেন। তখন ভোটারদের মনে প্রশ্ন জাগে আমীর যদি বিজয়ী হয়। তাহলে সিটি করেপারেশনের জন্ম নিবন্ধনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জন্য মানুষ সকালে আমীরের কাছে আসবে। কিন্তু আমীর তো ঘুম থেকে উঠবে বিকেল ৪-৫টায়, তখন কী প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে হবুল সাহেব সাক্ষর করতে পারবে? একজন অশিক্ষিত মাতাল লোকের চেয়ে শিক্ষিত যুবক হাসানকে ভোট দেয়াই ভালো। তাই আমীরের বাড়ির সামনে দুটি কেন্দ্রে হাসান হাসান ভোট পেয়েছে ৭৮২টি। আর হাসানের এলাকায় শিমরাইলের দুটি কেন্দ্রে আমির ভোট পেয়েছে মাত্র ২৫০ ভোট।
অপরদিকে পরিবহনে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে র‌্যাবের হাতে এক ভাই জহিরুল হক গ্রেপ্তার হওয়া ও র‌্যাবের দায়ের করা চাঁদাবাজি মামলায় অপর ভাই মনিরুল ইসলাম আসামী হওয়ায় বেকাদায় পড়ে  নজরুল ইসলাম। কারণ ভোটাররা বলছেন, যারা চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত তাদের ভোট দিয়ে লাভ কী? তাছাড়া ৮ম শ্রেণি পাশ নজরুল ইসলামও সন্ত্রাসী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। সাত খুনের মামলার প্রধান নুর হোসেন পালিয়ে যাওয়ার পর তার সা¤্রাজ্য দখল করে নেয় নজরুলরা ৪ ভাই। এনিয়ে জাতীয় পত্রিকায় একাধিক রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছে। একাধিক কিলার গ্রুপের সঙ্গে নজরুলের পরিচিতি রয়েছে। তার প্রচারনায় বহিরাগত অনেক সন্ত্রাসীদের দেখা গেছে। নজরুল ও তার ভাইদের ব্যবসা বলতে কাঁচপুর ব্রিজের নিচে জায়গা দখল করে অবৈধ  বালু ও পাথর ব্যবসা। এখন করছে নিয়মিত মাদক ব্যবসা ও পরিবহন থেকে চাঁদাবাজি। ভাইয়ের মধ্যে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হচ্ছে মনিরুল ইসলাম। সকল অপকর্মের লিড দেয় সে। অত্যন্ত চতুর এই সন্ত্রাসী বিশাল এক ক্যাডার বাহিনী নিয়ে চলাচল করে। দিনের বেলা তার তৎপরতা কম থাকলেও রাত হলেই শুরু হয় তার অপকর্মের ষোল কলা। গভীর রাত পর্যন্ত তার মাদকের জলসা ওপেন সিক্রেট। অথচ এই সন্ত্রাসী পরিবারের সদস্য বুইট্ট্রা নজরুল মাদক মুক্ত ও চাঁদাবাজমুক্ত সমাজ গড়ার কথা বলে ভোট চাচ্ছে। যাকে বলে ভুতের মুখে রামরাম। এই সব কারণে নজরুলের ভরাডুবি হয়।
অন্যদিকে আরিফুল হক হাসান জাতীয় শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি আবদুল মতিন মাস্টারে ছেলে। আবদুল মতিন মাস্টার ৭০’র দশকে কয়েক বছর শিমরাইল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। কিন্তু বিনিময়ে কোন বেতন নেননি। এছাড়া দীর্ঘ ৯ বছর জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালনের পাশপাশি  তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যতটুকু সম্ভব তিনি মানুষের উপকার করেছেন। কিন্তু কারো ক্ষতি করেননি। এলাকায় একজন ক্লিন রাজনৈতিক হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে।  তার দুই ছেলে এক ময়ের মধ্যে আরিফুল হক হাসান বড়। হাসানের শৈশব কাটে ঢাকার খিলগাঁওয়ে তার নানীর বাড়িতে। নানীর বাড়িতে থেকে গর্ভমেন্ট হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে। পরে নারায়ণগঞ্জ সরকারী তোলারাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করার পাশাপাশি ১৯৯৪ সাল থেকে সিদ্ধেশ্বরী অমর জ্যোতি ক্রিকেট ক্লাব (দ্বিতীয় বিভাগ দল) দিয়ে খেলাধূলার জীবন শুরু হয় তার। ২০০০ সালে যাত্রাবাড়ি ক্রীড়া চক্রের (১ম বিভাগ দল) অধিনায়ক নির্বাচিত হই। পরে বিভিন্ন সময় গোপীবাগ ফ্রেন্ডস এসোসিয়েশন, রূপালী ব্যাংক, ঢাকা মেরিনার্স ইয়াং ও নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া দলের হয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশীপে অংশগ্রহন করেছে। পরে বাবার তত্ত্বাবধানে থেকে ছোট খাটো ব্যবসা শুরু করে। সর্বশেষ ২০১১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত  ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি শিমরাইল শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিন প্রার্থীর অতীত ও বর্তমানের কর্মকান্ড বিচার বিশ্লেষন করে হাসানের পক্ষেই রায় দেয়। ফলে আলোচিত ৪নং ওয়ার্ডে বিজয় মুকুট পড়ে নুর হোসেনের আদরের ছোট ভাই হাসান।  হাসান পায় ৩৩৩৭ ভোট, আমী ভান্ডারী ২৩৯৭ এবং নজরুল ২২৯৫ ভোট।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here