সিটি করপোরেশন জানে না বাঘের মালিক কে

0
11

ঢাকা (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ):  রাজধানীর কারওয়ান বাজারে কাত হয়ে পড়া বাঘেরভাস্কর্য কারা স্থাপন করেছে তা জানে না সিটি করপোরেশন। শুক্রবার ভোরে কারওয়ান বাজারে বাঘের ভাস্কর্যচাপায় একজন রিকশা চালকের মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে ওই স্থানে ভাস্কর্য স্থাপনের পর তা আর রক্ষণাবেক্ষণের কোনো দায়িত্ব নেওয়া হয়নি। ফলে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে এর ভিত্তি (বেসমেন্ট) দুর্বল Tiger_Ranaহয়ে পড়াই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে ২০১১ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া আইসিসি বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা উপলক্ষে রাজধানীর সৌন্দর্যবর্ধন কর্মসূচি হাতে নেয় সিটি করপোরেশন। এ কাজে বিভিন্ন বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে তাদের বিজ্ঞাপনসহ সৌন্দর্যবর্ধনের অনুমতি দেয় সিটি করপোরেশন। কিন্তু কারওয়ান বাজারে বাঘের ভাস্কর্য স্থাপনের দায়িত্ব কাদেরকে দেওয়া হয়েছে তার কোনো দাফতরিক প্রমাণ নেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। শুক্রবারে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করলেও বর্তমানে এই কমিটির প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাস্কর্য স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানকে খুঁজে বের করা।

রাজধানীর সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ সিটি করপোরেশনের দুটি বিভাগকে দেওয়া থাকলেও মূলত রাজস্ব বিভাগই এ সব কাজ করে থাকে। এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ আমাদের বিভাগকে দেওয়া হলেও মূলত এ সব কাজ আরও দুটি প্রতিষ্ঠান করে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং সৌন্দর্যবর্ধন ও বিলবোর্ড বিজ্ঞাপনের কাজ করে রেভিনিউ (রাজস্ব) বিভাগ। আসলে কাগজে-কলমে আমাদের অনেক দায়িত্ব দেওয়া আছে। কিন্তু পরে দেখা যায় অন্য ডিপার্টমেন্ট আগে থেকেই স্ব-উদ্যোগী হয়ে এ সব কাজ করছে।’

পরে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মোস্তফা কামালের কাছে কারওয়ান বাজারের বাঘের ভাস্কর্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তার কাছে কোনো তথ্য নেই বলে জানান। তিনি বলেন, ‘এই ভাস্কর্যটি সম্পর্কে আমার দফতরে কোনো প্রমাণ নাই। আসলে এটা কে বসিয়েছে তা জানা নেই। এতটুকু নিশ্চিত রাজস্ব বিভাগ থেকে এই ভাস্কর্য বসানো হয়নি বা কাউকে অনুমতিও দেওয়া হয়নি। অন্য কোনো বিভাগ দিয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।’

একই কথা জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনসার আলী। তিনি বলেন, ‘রাজস্ব কিংবা নগর পরিকল্পনা বিভাগ বা সিটি করপোরেশন এই ভাস্কর্যটি স্থাপন করেনি। কোনো প্রতিষ্ঠানকেই এ ব্যাপারে অনুমোদন দেয়নি। দুর্ঘটনা ঘটার পর একেকজন একেক তথ্য দিচ্ছেন। আমরা তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছি। এই কমিটি তদন্ত করে বের করবেভাস্কর্যটি কে বা কারা স্থাপন করেছে।’

রাজধানীতে এমন আর কোনো ‘বেওয়ারিশ’ ভাস্কর্য বা স্থাপনা আছে কি না, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একটা যখন পাওয়া গেছে তখন আরও থাকতে পারে। আমরা একে একে সবগুলোই যাচাই করব।’

এদিকে ২০১১ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট উপলক্ষে রাজধানীর সৌন্দর্যবর্ধন ও ভাস্কর্য স্থাপনের ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের সরাসরি কোনো হাত ছিল না বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা  জানান। তিনি বলেন, ‘এই কাজগুলো তখন ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশে ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অনুমোদন এবং সুপারিশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান করেছে।’

এই কর্মকর্তা বলেন, ‘দাফতরিক কোনো প্রমাণ না থাকায় সঠিক তথ্যটি মনে নেই। যতদূর মনে পড়ে কারওয়ান বাজারের ভাস্কর্যটি ইসলামী ব্যাংক অথবা বাংলাদেশ পাবলিসিটি যে কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বসিয়েছে। তবে ইসলামী ব্যাংক হওয়ার সম্ভাবনাটা বেশি। কারণ ওই সময় ইসলামী ব্যাংককে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ দেওয়া নিয়ে বেশ বিতর্কও উঠেছিল।’

বিষয়টি নিশ্চিত হতে ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান তথ্য কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা উপলক্ষে ইসলামী ব্যাংক বিভিন্ন সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ পেলেও কোনো ভাস্কর্য বা স্থাপনা বসানোর কাজ পায়নি।’

অন্যদিকে বাংলাদেশ পাবলিসিটির স্বত্ত্বাধিকারী মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে সেটা মিথ্যা। আমরা সি.আর দত্ত রোড, পান্থপথ রোডের ডিভাইডারের আইল্যাণ্ডের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করে থাকি। কিন্তু কোনো প্রকার ভাস্কর্য স্থাপন করি না। ২০০৭ সাল থেকে আমরা এই কাজ করে আসছি। আর এই ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে ২০১০ সালে। তখন হয়তো বিশ্বকাপ না হয় সাউথ এশিয়ান গেমস উপলক্ষে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে একটি কমিটি এ সব কাজের করেছে। তখন তারা কোন প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিয়েছে তা আমার জানা নেই।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম-সম্পাদক ও নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবীব বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে একটি ভাস্কর্য রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে পড়ে আছে। সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনও ঝুলছে। যখনই এখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে তখন আমি জানি না, আমি জানি না রব উঠেছে। খাওয়ার বেলায় সবাই আছে দায়িত্ব নেওয়ার বেলায় কেউ নাই।’

ইকবাল হাবীব বলেন, ‘সিটি করপোরেশন বলছে এটা তারা স্থাপন করেনি, কাউকে অনুমতিও দেয়নি। তাহলে প্রশ্ন হল এটা কে স্থাপন করেছে। এতদিন কেন সিটি করপোরেশন জানল না এটা বেওয়ারিশ। আসলে রাজধানীতে যে কয়টি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে কেউই তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে প্রতিপালন করছে না। এখানে প্রতিষ্ঠানগুলোর যে সামান্য জবাবদিহিতার বাধ্যবাধকতা নেই, তার প্রমাণ এই ভাস্কর্য দুর্ঘটনা। প্রায় এমন ঘটনা ঘটছে। কিন্তু সবাই উদাসীন।’

ইকবাল হাবীব বলেন, ‘বিশ্বকাপ ক্রিকেট উপলক্ষে রাজধানীর সৌন্দর্যবর্ধনের যে কাজ হাতে নেওয়া হয়েছিল তা মূলত সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে হয়েছিল। সেখানে সিটি করপোরেশন, রাজউক, বেসরকারি অর্গানাইজেশন নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। তারপর কে কি কাজ করবে তা নির্ধারণ করা হয়। এখন সিটি করপোরেশন যদি বলে আমাদের জানা নেয় তাহলে তো হবে না।’

তিনি বলেন, ‘মজার বিষয় হল ভাস্কর্যটি ভেঙে পড়ার আগেও ওই খানে স্থাপনকারী স্পন্সরের নাম ও বিজ্ঞাপন ছিল। কিন্তু এখন সেখানে কিছুই নেই। রাতারাতি গায়েব হয়ে গেছে। সিটি করপোরেশনের কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের কারণে নগরটার আজ ভঙ্গুর দশা।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here