আজ: বুধবার, ২৩শে আগস্ট, ২০১৭ ইং, ৮ই ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল, ২রা জিলহজ্জ, ১৪৩৮ হিজরী, সকাল ১০:৩৭

জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী

আমিনুল ইসলাম সুজন (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ): মানুষ সোজা হয়ে তখনই দাঁড়াতে পারে, যখন তার মেরুদণ্ড সোজা থাকে। যার মেরুদণ্ড বেঁকে যায় বা ভেঙে যায়, তিনি কখনও সোজা হয়ে দাঁড়াতে বা হাঁটতে পারেন না। তাকে তখন আর স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয় না। সোজা হয়ে হাঁটতে না পারার কারণে তাকে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। তিনি  প্রতিবন্ধী ব্যক্তি (শারীরিকভাবে) হিসাবে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশে সাধারণভাবে সুস্থ্ মানুষের চলাচলই (গণপরিবহনে কিংবা ঢাকার ফুটপাথে যাতায়াত) অনেক শারীরিক কসরতের প্রয়োজন হয়। সেখানে মেরুদণ্ড বাঁকা  মানুষের চলাচল অসম্ভবই বটে। তার মানে, মেরুদণ্ড বেঁকে বা ভেঙে যাওয়ার কারণে যিনি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন, মেধায় পারঙ্গম হলেও রাষ্ট্রে সহায়ক পরিবেশ না থাকায় সেই ব্যক্তি পরিবার ও সমাজে বোঝা হিসাবে পরিগণিত  হন। রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও নীতিগত পরিকল্পনায় অবহেলার শিকার হন।

মানুষের সোজা হয়ে চলাচলে যেমন মেরুদণ্ড গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের গতিশীল নেতৃত্বের জন্য শিক্ষা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্যই শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়। একটা জাতি যদি শিক্ষিত হয়, তবে সে জাতির মেরুদণ্ড শক্ত ও সোজা বলে ধরে নেওয়া হয়। যে রাষ্ট্র শিক্ষাকে যত বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, সেই রাষ্ট্র উন্নতিতে তত বেশি এগিয়ে গেছে। পেশাগত প্রয়োজনে অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে একাধিকবার ভ্রমণের সুবাদে দেখেছি, তারা শিক্ষাকে কতটা গুরুত্ব দেয়। কানাডা, জাপান, নরওয়ে, সুইডেন, যুক্তরাজ্য ইত্যাদি দেশও জলজ্যান্ত উদাহরণ।

কিন্তু বাংলাদেশ হইলো তার ঠিক উল্টা। একদিকে সরকার দেশকে উন্নত করার স্বপ্ন দেখে। আরেক দিকে উন্নত হওয়ার প্রধান যে শর্ত, শিক্ষা। সেই শিক্ষা অর্জন থেকে তরুণ সমাজকে বিরত রাখতে নানারকম অপচেষ্টা লক্ষ করা যায়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত অনেক  সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—যার কিছু কিছু সার্বিকভাবে শিক্ষাখাতে নানামুখী সংকট তৈরি করেছে।

২০১৪ সালের এক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে ৮০টির মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও প্রকৌশল কলেজেও অনেক শিক্ষার্থী লেখাপড়া করেন। এ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমবেশি প্রায় ২৫ লাখ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন বরাদ্দ না পেয়ে অনেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। এছাড়া দলীয় রাজনীতিমুক্ত হওয়ায় অনেক পরিবার কষ্ট করে হলেও তাদের সন্তানকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। এদের অনেকে দরিদ্র পরিবার থেকেও এসেছে। কিন্তু একটু উন্নত ভবিষ্যতের আশায় মা-বাবা কষ্ট করে তাদের সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যান।

যেখানে রাষ্ট্র বা সরকার সবার লেখাপড়ায় কোনও ভূমিকা রাখতে পারছে না, সেখানে নানা নিয়মের বেড়াজালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ও তাদের পরিবারের জন্য সমস্যা বাড়িয়ে তুলছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ব্যয় এমনিতেই বেশি। সরকার যদি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কড়া তদারকির মধ্যে এনে শিক্ষার্থীদের বেতন বা সেমিস্টার ব্যয় কমিয়ে আনত, তবে সরকার সাধুবাদ পেত। কিন্তু অত্যন্ত অন্যায়ভাবে অর্থমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের প্রদত্ত টিউশন ফি’রওপর ৭.৫% মূল্য সংযোজন কর (ভ্যালু এডেড ট্যাক্স বা ভ্যাট) আরোপ করেন।

শিক্ষাতো কোনও ব্যবসায়িক পণ্য নয়। এখান থেকে মুনাফার চিন্তা যেমন অনৈতিক, তেমনি এ খাতে ভ্যাট আরোপও অনৈতিক। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবাখাত হিসাবেই পরিগণিত। বাংলাদেশের সংবিধানেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মৌলিক অধিকার হিসেবে চিহ্নিত। এই মৌলিক অধিকার অর্জনে ছাত্র-ছাত্রীদের যেখানে সহায়তা করার কথা, সেখানে সরকার উল্টো উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যয় করা অর্থের ওপর ভ্যাট আরোপ করেছে।

ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে দীর্ঘদিন থেকেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলে আসছিল। যেহেতু শিক্ষাখাতে ভ্যাট আরোপের ওপর সুবিধাবাদী ও ক্যাডারভিত্তিক ছাত্রসংগঠনগুলোর (ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির) কিছু যায় আসে না—তাই এ নিয়ে বড় আকারের আন্দোলনও হয়নি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা দলনিরেপক্ষভাবে সীমিত পরিসরে এ আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। এছাড়া ছাত্র ইউনিয়নসহ আদর্শিক ও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর উদ্যোগেও আলাদা কর্মসূচি চলছিল। এরই অংশ হিসাবে ৯ সেপ্টেম্বর ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন করছিল। তাদের আন্দোলন যৌক্তিক, নৈতিক ও ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু পুলিশ তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করেছে বলে বাংলা ট্রিবিউনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমসূত্রে জানতে পারি। এতে ছাত্র-ছাত্রীদের সড়ক থেকে সরিয়ে নিতে যাওয়া শিক্ষকও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে দেখেছি। গুলি করার মতো পুলিশের এই বাড়াবাড়ি অনৈতিক।

ঢাকায় সবসময়ই যানজট হয়। তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কিছুটা হয়ত দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলেছিল। কিন্তু তারা তো সরকারের মনোযোগ আকর্ষণের জন্যই রাস্তায় এসেছিল। তারা কারও ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া বা কাউকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য আন্দোলন করেনি। তাই ছাত্র-ছাত্রীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে গুলি করার ঘটনা ন্যাক্কারজনক হিসেবেই দেখছি।

প্রসঙ্গত, তিন বছর আগের (২০১২ সালের মে) একটা ঘটনা মনে পড়ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের চাকরি জাতীয়করণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে কর্মসূচি পালন করছিলেন। কিন্তু আমরা দেখেছিলাম, পুলিশ বিপুল উদ্যোমে নিরীহ শিক্ষকদের লাঠিপেটা করেছিল, অসহনীয় গরমের দিনে গরম পানি ছুড়েছিল। পুলিশের নিক্ষেপিত গরম পানির ধকল সইতে না পেরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমান। যে পুলিশ শিক্ষকদের দিকে গরম পানি ছুড়ে মেরেছিল, কিংবা যে পুলিশ কর্মকর্তা নির্দেশ দিল, সে পুলিশদের শৈশবে পড়িয়েছেন সিদ্দিকুর রহমানের  মতোই কোনও শিক্ষক। পুলিশের কমিশনার, আইজি, স্বরাষ্ট্রসচিব, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী—তাদেরও শৈশবে পড়িয়েছেন কোনও না কোনও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা মারা গেলেন পুলিশের আঘাতে, সে ঘটনায় কোনও পুলিশের স্থায়ী চাকরি-চ্যুতি বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে কি না, আমার জানা নেই।

অন্যদিকে, সরকার সম্প্রতি সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু এখানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মারাত্মকভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। এ জন্য বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা আন্দোলন করছেন। অবশ্যই অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লাভজনক পরামর্শকের ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু সে জন্য তাদের বেতন বাড়ানো হবে না—এটা তো কোনও নিয়মত হতে পারে না। সরকারি কর্মকর্তা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। এজন্যই তো সরকারি কর্মকর্তাদের বেতনভাতা বাড়ানো আটকে থাকেনি। কারণ, সরকার জানে, সব সরকারি কর্মকর্তাই দুর্নীতিবাজ নন। সে বিষয় বিবেচনায় নিয়েই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতনও বাড়ানো দরকার ছিল। তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হলে তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মতো লাভজনক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।

পদমর্যাদার দিক থেকেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অবস্থান আশাব্যঞ্জক নয়। সাধারণত, লেখাপড়ায় সবচেয়ে  মেধাবী শিক্ষার্থীই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিশেষ দলীয় বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ হলেও সে হার খুবই কম। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অবস্থান ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডিন্সিতে নতুন করে নির্ধারণ করা দরকার।

এ বছরের শুরুতে মসুপ্রিম কোর্ট ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডিন্স সংক্রান্ত এক রিট আবেদনের চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে নির্দেশনাসহ নতুন ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডিন্স নির্ধারণের জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। মূলত ১৯৮৬ সালে স্বৈরশাসক এরশাদের সময় প্রণীত ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডিন্সির বিরোধিতা করে করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন, সরকার আপিল করার পর তা এ বছরের শুরুতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা হয়। কিন্তু এই নির্দেশনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের অবস্থানের উন্নতি হয়েছে কি না, তা জানা নেই। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত কোনও প্রতিবেদনেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অবস্থান সম্পর্কে কোনও কিছুই লক্ষ করা যায়নি। তার মানে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অবস্থানেরও পরিবর্তন হয়নি।

এক্ষেত্রে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও জাতীয় অধ্যাপকের অবস্থান অবশ্যই কেবিনেট সচিব ও মুখ্যসচিব, তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে প্রথম দিকেই থাকা উচিত। অধ্যাপক ইমিরেটাস এর অবস্থান সিনিয়র সচিব এবং একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের (অধ্যাপক হিসাবে ছয় বছর পার করার পর) অবস্থান সচিবদের সমমানের হওয়া উচিত। নতুন যিনি অধ্যাপক হবেন, তার অবস্থান যুগ্ম-সচিব এবং তিন বছর পর অধ্যাপকের অবস্থান অতিরিক্ত সচিবের সমান হতে পারে।

বেসরকারি শিক্ষাখাতে ৭.৫% ভ্যাট আরোপ ও সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন হার নতুন করে নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী যেভাবে শিক্ষাখাতকে অবহেলা করেছেন,  তা অবশ্যই নিন্দনীয়। যদি সরকারের বর্তমান সিদ্ধান্ত অটল থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে জাতির মেরুদণ্ডই ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং এ জন্য অর্থমন্ত্রীই দায়ী থাকবেন।  আশা করি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যাট আরোপ এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা পুনঃনির্ধারণ করে অর্থমন্ত্রী জাতির মেরুদণ্ড শক্ত করতে ভূমিকা রাখবেন।

লেখক: সাংবাদিক ও নীতি বিশ্লেষক

Share

Author: 24bdnews

4543 stories / Browse all stories

Related Stories »

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুকে আমরা »

ছবি সংবাদ »

নিউজ আর্কাইভ »

MonTueWedThuFriSatSun
 123456
21222324252627
28293031   
       
     12
3456789
10111213141516
24252627282930
31      
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031    
       
     12
17181920212223
24252627282930
       
  12345
2728     
       
      1
23242526272829
3031     
   1234
262728293031 
       
   1234
12131415161718
       
      1
3031     
29      
       
      1
16171819202122
30      
   1234
12131415161718
19202122232425
262728293031 
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930    
       
     12
17181920212223
24252627282930
31      
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
       

সবশেষ সংবাদ »

সারাদেশ »