সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণে সরকার ‘ব্যর্থ’

0
5

ঢাকা (বাংলঅ ২৪ বিডি নিউজ): ফেসবুক, ভাইবার, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বন্ধে পুরোপুরি সক্ষমতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার ও বিটিআরসি। সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার চতুর্থ দিনেও বেশকিছু ব্যবহারকারীকে এই সুবিধাসমূহ গ্রহণ করতে দেখা গেছে।

যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির চূড়ান্ত রায়ের দিনে ১৮ নভেম্বর বাংলাদেশে ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল সরকার।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বন্ধের কারণ ব্যাখ্যা করে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী তারানা হালিম ওইদিন বলেন, ‘নাশকতা রোধের জন্যই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। এই ব্যবস্থা সাময়িক। সবুজ সংকেত পেলেই খুলে দেওয়া হবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালও ১৮ নভেম্বর বলেছিলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত সাময়িক। নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড রোধে এই সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে সেই নাশকতার ঘটনা দেশে না ঘটলেও ফেসবুকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে মুজাহিদ-সাকার অনুসারী ও জামায়াত-শিবিরকর্মীদের প্রপাগান্ডা অব্যাহত রয়েছে। এ কাজে বিকল্প হিসেবে টোর, প্রক্সি সার্ভার ও ব্রাইজার ব্যবহার করে বেশকিছু ফেসবুক ব্যবহারকারীকে এই সুবিধা গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে।

অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে তরুণপ্রজন্মও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয়।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তফা জব্বার  এ বিষয়ে বলেন, ‘যে প্রযুক্তি নিয়ে আমরা কথা বলছি, সেই ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সীমানা কোথায় তা আমরা জানি না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধের যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তার প্রয়োজন ছিল না। বিষয়টা সিম্পল, অপরাধীরা যেমন এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বা সাধারণ জনগণ তারাও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজাকার মুজাহিদ ও সাকার ফাঁসি দেওয়ার জন্য সাত দিন ইন্টারনেট বন্ধ রাখলেও রাজী আছি। কিন্তু সরকার যাদের ভয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ রেখেছে তারা তো এগুলো ব্যবহার করছে। বরং এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুলে দিলে আমরা এই রায়ের পক্ষে প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তা ব্যবহার করতে পারতাম। যারা বিপক্ষে রয়েছেন তাদের চেয়ে আমাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. হাসানুজ্জামান  বলেন, ‘আসলে সরকার চাইলেই তো আর সব বন্ধ করতে পারে না। ইন্টারনেটের কিছু নেটওয়ার্ক মোবাইল অপারেটর, কিছু নেটওয়ার্ক সরকার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সরকার যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করে সেগুলো বন্ধ করতে পারা সরকারের সাকসেস। সরকার কিছু কন্ট্রোল করতে পেরেছে। এটাকে কিছুটা সাকসেস বলা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বন্ধ করে সরকার গ্রাহকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। সরকার ফেসবুক চালু রেখে ফিল্টার করতে পারত। মুখ বন্ধ করে তো আর মিথ্যা বলা বন্ধ করা যাবে না। মুখ খোলা রেখেই বন্ধ করতে হবে। মুখ বন্ধ হলে তো স্বাভাবিক কার্যক্রমই বন্ধ হয়ে যাবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক মফিজুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, ‘যাদের কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করা হয়েছে তারা তো বিভিন্ন বিকল্প মাধ্যমে ঠিকই তাদের স্বার্থ হাসিল করছে। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ না করে মনিটরিং করা উচিৎ। তা ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করার কারণে বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হতে পারে। ফলে যারা অপরাধী তাদের কারণে যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যমগুলো পুরোপরি বন্ধ করা ঠিক হবে না। তাদের চিহ্নিত করে এগুলো আবার সচল করা উচিৎ।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নূরুল আমিন বেপারি  বলেন, ‘যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ফেসবুকে প্রপাগান্ডা চালাতেন তারা তো এখনো সক্রিয় রয়েছেন। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির পক্ষেও তো অনেক সক্রিয় এ্যাক্টিভিস্ট রয়েছেন। সরকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বন্ধ করে বোকামী করেছেন। এগুলো এখনই চালু করা উচিৎ। প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের যুগে কোনো কিছু আটকে রাখা সম্ভব নয়।’

ফেসবুকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সক্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইফ উদ্দিন বাবু  বলেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। অবশ্য বাংলাদেশের বেশীরভাগ মানুষই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই দাবিতে বেশী সোচ্চার। গণজাগরণ মঞ্চের সৃষ্টিও ফেসবুকের মাধ্যমে। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ না করে চালু রাখলেই দেশের মানুষ এই রাজাকারদের মুখোশ আরও বেশী উন্মোচন করতে পারত।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সচিব সরওয়ার আলম  বলেন, ‘অনেকে প্রক্সি সার্ভার ও নানা এ্যাপসের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করছে। আমরা এগুলোও বন্ধের চেষ্টা করছি। আমরা ব্যর্থ বলা যাবে না। বরং আমরা ৯০ শতাংশই সফল।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here