আজ: মঙ্গলবার, ১৩ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং, ২৯শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল, ৬ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী, সকাল ১১:১৮

বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা দুই শিবিরেই আছে

ঢাকা (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ): আসন্ন পৌর নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের প্রক্রিয়া শেষ করেছে শীর্ষ দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। নিজেদের জনপ্রিয়তা প্রমাণের বড় চ্যালেঞ্জ দুই দলের সামনেই। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচন ঘিরে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে দুই শিবিরেই। মনোনয়ন নিয়ে বিদ্রোহের সুর উঠেছে দুদলেই। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষদিন গতকাল দল মনোনীত প্রার্থীরা দলীয় প্রত্যয়নসহ মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। মনোনয়নবঞ্চিত অন্যরাও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জমা দিয়েছেন তাদের মনোনয়নপত্র। গত দুইদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সে অসন্তোষ ও বিদ্রোহের প্রকাশ ঘটছে। বেশ কয়েকটি পৌরসভায় পদত্যাগ করেছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। বিক্ষোভ ও স্লোগান মুখর হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়। এমনকি প্রার্থীদের শারীরিকভাবে নিগৃহীত করার ঘটনাও ঘটেছে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে দুই দল থেকেই নেয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলের বিদ্রোহীদের জন্য কড়া হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলেই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। এমন হুঁশিয়ারি থাকলেও মাঠে ঠিকই আছেন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীরা। দলীয় সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করেই সদম্ভে নির্বাচনের মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। তবে, বিদ্রোহী নন দলের পরিচয়ের বাইরে গিয়ে নতুন নিয়মে ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন তারা। ফলে, কেন্দ্র থেকে মনোনীত প্রার্থীদের জয়লাভে পথের কাঁটা হিসেবে থাকবেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা- এমন আশঙ্কা আওয়ামী লীগের কেন্দ্র ও তৃণমূল নেতাদের। ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে ভোটের লড়াইয়ে অংশ নেয়ার জন্য গতকাল ছিল মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিন। দেশের বিভিন্ন পৌরসভায় কেন্দ্র থেকে মনোনীত আওয়ামী লীগের একক প্রার্থীরা তাদের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। পাশাপাশি মনোনয়ন বঞ্চিত বিদ্রোহী প্রার্থীরাও নির্বাচনে ভোটের লড়াইয়ে থাকার ঘোষণা দিয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। তারা ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, যাই হোক শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠ থেকে তারা সরে যাবেন না। এদিকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। পৌরসভা নির্বাচনে যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা এতদিন শুধু মুখে মুখে বলে আসছিলেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল কেন্দ্রীয় নেতারা। গতকাল ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে দলের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। তিনি বলেছেন, আমাদের দলীয় প্রধানের সই করা মনোনয়নপত্র দিয়ে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। দলের সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করে কেউ নির্বাচনে অংশ নিলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সর্বোচ্চ (বহিষ্কার) ব্যবস্থা নেয়া হবে। ওদিকে বুধবার সন্ধ্যার পর বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছে বিভিন্ন পৌরসভায় মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাদের কর্মী-সমর্থকরা। দলের মনোনয়ন বঞ্চিতরা তুলছেন নানা অভিযোগ। বিএনপির দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত ও তাদের সমর্থকরা বলছেন, আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অনেক জায়গায় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। কোন কোন জায়গায় কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা ও স্থানীয় এমপিদের প্রভাবে পাল্টে গেছে তৃণমূলের মতামত। দলীয় মনোনয়ন চেয়ে না পাওয়া বিএনপির নেতারাও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই থাকছেন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়। বিএনপি সূত্র জানায়, বেশির ভাগ পৌরসভায় বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে অনেক পৌরসভায় অনানুষ্ঠানিকভাবে বিকল্প প্রার্থীও দেয়া হয়েছে। চেয়ারপারসন চিঠি দিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দেয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, অন্তত ১০০ পৌরসভায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের মাঠে সক্রিয় থাকতে পারেন বিদ্রোহীরা। তার ওপর রয়েছেন জোটের শরিক দলের প্রার্থীরা। রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে এবার জামায়াত এমন সব প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছেন যারা স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য কিন্তু দলটির পদ-পদবিধারী খুব সক্রিয় নন। ফলে কোন পৌরসভায় কে জামায়াতের সমর্থন পাচ্ছেন সে ব্যাপারে বিএনপিতেও নেই পরিষ্কার ধারণা।
মাঠে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা
এদিকে দেশের বিভিন্ন পৌরসভায় বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিভিন্নভাবে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। গতকাল শেষ দিনে মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেশের অনেক পৌরসভাতেই বিদ্রোহী প্রার্থীদের স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা বোঝাতে চেষ্টা করেছেন। সমঝোতার চেষ্টাও হয়েছে কোথাও কোথাও। এ ধরনের সিদ্ধান্তে ভোটের মাঠের ফলাফল অন্য দলের অনুকূলে চলে যাবে বলেও বিদ্রোহীদের বোঝানো চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু প্রবোধ মানেননি বিদ্রোহীরা। দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করলে বহিষ্কারের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
বগুড়ার ধুনট পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শরীফুল ইসলাম খানকে মনোনয়ন দিয়েছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র এজিএম বাদশা এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য, ধুনট পৌরসভার বর্তমান কমিশনার আল আমিন তরফদার নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দেন। মনোনয়ন না পেয়ে গতকাল দুজনই স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে আল আমিন তরফদার দল থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনী মাঠে থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকবেন বলে ইতিমধেই তিনি ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। অন্যদিকে এজিএম বাদশা বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
রাজশাহীর কাটাখালিতে বিদ্রোহী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন। এই পৌরসভায় দলের কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা আব্বাস আলী। এ ছাড়া পুঠিয়া পৌরসভায় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জিএম হীরা বাচ্চু দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে তিনি গতকাল মনোনয়নপত্রও জমা দিয়েছেন। পুঠিয়া পৌরসভায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে মনোনীত একক প্রার্থী রবিউল ইসলাম রবি। চারঘাট পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন নার্গিস খাতুন। এখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন একই দলের গোলাম কিবরিয়া বিপ্লব। দুর্গাপুরে তোফাজ্জল হোসেন কেন্দ্রের মনোনয়ন পেলেও হাসানুজ্জামান সান্টু আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। মুণ্ডুমালা পৌরসভায় গোলাম রাব্বানীকে আওয়ামী মনোনয়ন দিলেও একই দলের অধ্যাপক লুৎফর রহমান আহসানুল হক স্বপন বিদ্রোহী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এছাড়া নওহাটা পৌরসভায় আবদুল বারী খান আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিলেন। তার বিরুদ্ধে একই দলের আফজাল হোসেন বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করেছেন। আড়ানী পৌরসভায় নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন মোক্তার আলী। একই পৌরসভায় দলের বিদ্রোহী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন মতিউর রহমান মতি ও মাসুদ পারভেজ কলিন্স।
নড়াইলের কালিয়া পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন কালিয়া থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ওয়াহিদুজ্জামান হীরা। আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত বর্তমান মেয়র এডভোকেট এমদাদুল হক টুলুও বুধবার তার মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো। এতে যদি কেন্দ্র থেকে আমার বিরুদ্ধে কোন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয় তাতেও আমার আপত্তি নেই। ওদিকে কুমিল্লার দাউদকান্দি পৌরসভায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন নাঈম ইউসুফ। কিন্তু গতকাল এই পৌরসভায় নির্বাচনের জন্য নাঈম ইউসুফের পাশাপাশি পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার শাহজাহান গতকাল মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে নির্বাচনের মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। একই পৌরসভায় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বর্তমান মেয়র হাজী আবদুস সাত্তার।
মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষদিনে গতকাল মানিকগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মো. রমজান আলী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিসহ দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে রিটার্নিং অফিসারের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর আগে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গাজী কামরুল হুদা সেলিমও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তার মনোনয়নপত্র জমা দেন। ওদিকে সিরাজগঞ্জ সদরে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন সৈয়দ আবদুর রউফ মুক্তা। এই পৌরসভায় নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক আহ্বায়ক শামসুজ্জামান আলো। কিন্তু মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়ে গতকাল মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তিনি। একই জেলার উল্লাপাড়ায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন ফয়সাল কাদির রুমী। দলের কোন পদ-পদবিতে না থাকলেও তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে পরিচিত। গতকাল তিনি মনোনযনপত্র জমা দিয়েছেন। জেলার শাহজাদপুর পৌরসভায় পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ভিপি আবদুর রহিম এই পৌরসভা থেকে নির্বাচনের জন্য প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছিলেন। কিন্তু কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে হালিমুল হক মিরুকে। এ কারণে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে গতকালই নিজের মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন আবদুর রহিম।
সিলেটের তিনটি পৌরসভাতে আওয়ামী লীগের পাঁচজন বিদ্রোহী প্রার্থী নিজ দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। ইতিমধ্যে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমাদান প্রক্রিয়াও শেষ হয়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে ভোট ভাগাভাগি হলে পৌর আসন হারাতে হবে- এমন আশঙ্কা জানিয়েছেন তৃণমূলের নেতারা। তবে, প্রত্যাহারের শেষদিন পর্যন্ত একক প্রার্থীকেই ভোটযুদ্ধে নামানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সিলেট আওয়ামী লীগ। সিলেটের ৩ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের ৫ জন বিদ্রোহী প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে গতকাল মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গোলাপগঞ্জে শেষ মুহূর্তে প্রার্থী বদল করে বর্তমান পৌর মেয়র জাকারিয়া আহমদ পাপলুকে মনোনয়ন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে, গতকাল এই পৌরসভায় আরও দুই আওয়ামী লীগ নেতা ‘স্বতন্ত্র’ হিসেবে তাদের নিজ নিজ মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তারা হলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক সিরাজুল জব্বার চৌধুরী ও লন্ডন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রাবেল। জকিগঞ্জ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ফারুক আহমদ। কানাইঘাটে বর্তমান মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি লুৎফুর রহমানের বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন প্রভাবশালী নেতা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন আল মিজান। ইতিমধ্যে দু’জনই মনোয়নপত্র জমা দিয়ে নির্বাচনী মাঠ না ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এ বিষয়ে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী জানান, এখনও সময় আছে। সব পৌরসভায়ই একক প্রার্থী থাকবে। আর নৌকার প্রার্থীর পক্ষে দলের সব স্তরের নেতারা একাট্টা হয়ে মাঠ থাকবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
টাঙ্গাইলের সখীপুর পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়ায় বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সংসদ সদস্য অনুপম শাহজাহান জয়ের চাচাত ভাই জাহাঙ্গীর তালুকদার। গতকাল তিনি তার মনোনয়নপত্র সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন। তবে নিজেকে আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ নন দাবি করে সাংবাদিকদের তিনি জানান স্বতন্ত্র হিসেবে তিনি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
খুলনার পাইকগাছা ও চালনা পৌরসভায় আওয়ামী লীগের তিন বিদ্রোহী প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। পাইকগাছা পৌরসভার মেয়র পদে পাইকগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বর্তমান মেয়র সেলিম জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগের প্রার্থী হলেও এখানে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শেখ কামরুল হাসান টিপু ও তার আপন ভাই জেলা যুবলীগ নেতা প্যানেল মেয়র আনিসুর রহমান মুক্ত। এ ছাড়া চালনা পৌরসভার মেয়র পদে কেন্দ্রীয়ভাবে মনোনয়ন পেয়েছেন পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সনৎ কুমার বিশ্বাস। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে বর্তমান মেয়র ড. অচিন্ত্য কুমার মণ্ডল মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। চালনায় বিগত পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন ড. অচিন্ত্য কুমার মণ্ডল। পরে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ৬ জন বিদ্রোহী প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী আতাউর রহমান সরকার ছাড়াও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে উপজেলা আওয়ামী লীগ সদস্য মুকিতুর রহমান রাফি ও পৌর আওয়ামী লীগ সদস্য কে এম জাহাঙ্গীর আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের উদ্দেশ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। সুন্দরগঞ্জ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন আবদুল্লাহ আল মামুন। তবে, একই পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন পৌর আওয়ামী লীগ সহসভাপতি এ বি এম মাসুদুল ইসলাম চঞ্চল, উপজেলা আওয়ামী লীগ সদস্য লুৎফর রহমান মুক্তাসহ আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে পরিচিত অধ্যক্ষ শাহিন আহমেদ ও দেবাশীষ কুমার সাহা নামে দুজন।
বিদ্রোহের সুর বিএনপিতে: এদিকে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌরসভার বর্তমান মেয়র আলমগীর চৌধুরী বাদশার জায়গায় এবার দলের মনোনয়ন পেয়েছেন রেজাউল করিম। বুধবার রাত ১০টার দিকে মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে গুলশান চেয়ারপারসন কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন আলমগীর চৌধুরীর সমর্থকরা। একপর্যায়ে তার ছোট ভাই মিলন চৌধুরী বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ের গেটে লাথি মারতে শুরু করেন। ওই সময় মিলন চৌধুরী চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘মনোনয়ন চাই না, গয়েশ্বর আর টিপুকে চাই। ওই দুইটারে বের করে দে। ওরা বিএনপিকে শেষ করে দেবে। টিপু সহ-দপ্তর সম্পাদক হয়েই মনোনয়ন বাণিজ্য শুরু করেছেন।’ পরে চেয়ারপারসনের নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেন। হতাশ আলমগীর চৌধুরী বাদশা বলেন, ‘সর্বশেষ পৌর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে মেয়র হয়েছিলাম। প্রত্যাশা ছিল দলীয় প্রতীক ও মনোনয়নের ভিত্তিতে প্রথম পৌর নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পাবো।’ এর আগে বুধবার বিকালে চেয়ারপারসনের কার্যালয়েই মারামারি করেছেন নরসিংদীর মনোহরদী পৌরসভায় দুই মনোনয়ন প্রার্থীর সমর্থকরা। সেখানে মনোনয়ন পেয়েছেন সংস্কারপন্থি নেতা সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের সমর্থক মাহমুদুল হক। সাবেক এমপি জয়নুল আবদিনের সমর্থক আবদুল খালেক মিয়া পাননি। মাহমুদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, প্রত্যয়নপত্র নিতে আমি গুলশানের কার্যালয়ে গেলে পেছন থেকে হঠাৎ কয়েকজন আমাকে কিলঘুষি মারতে শুরু করেন।
মাদারীপুরের শিবচর পৌরসভায় বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন জাহাঙ্গীর কামাল। যিনি ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার খুলনা সফরের পথে কাওড়াকান্দি ফেরিঘাটে গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার ১৫ নম্বর আসামি। সেখানে জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে পৌর বিএনপির সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফিকের নাম প্রস্তাব করা হলেও কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে জাহাঙ্গীর কামালকে। মামলার কথা স্বীকার করে জাহাঙ্গীর কামাল বলেছেন, রাজনৈতিক বিরোধের কারণে তার নামে মামলা দেয়া হলেও মামলার বাদী তার বর্তমানে তার সমর্থক। মনোনয়নবঞ্চিত শফিকুল ইসলামের সমর্থকরা অভিযোগ করেছেন, মনোনয়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে জেলা কমিটির প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান প্রভাব খাটিয়ে এ পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। এ নিয়ে স্থানীয় বিএনপিতে দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ। ওদিকে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় জোটের শরিক জাতীয় পার্টির (জাফর) প্রার্থী মহিউদ্দিন বানাত ও মিরপুরে আবদুল আজিজকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা-থানা ও পৌর বিএনপি ভেড়ামারায় যুবদল নেতা শামীম রেজা ও মিরপুরে থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রহমত আলীর নাম প্রস্তাব করেছিল। কেন্দ্র থেকে এ প্রস্তাব এড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি শহীদুল ইসলাম বলেন, এ মনোনয়নে বিএনপির নেতাকর্মীরা বিস্মিত, ক্ষুব্ধ। তিনি মনে করেন, মহিউদ্দিন বানাত চার-পাঁচশ ভোট পেতে পারেন।
রাজশাহীর তাহেরপুর পৌর ছাত্রদলের সভাপতি এস এম আরিফুল ইসলাম মনোনয়ন চেয়ে পাননি। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তৃণমূলের কোনো মতামত নেয়া হয়নি। ঢাকায় বসে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান নিজের ইচ্ছায় মনোনয়ন দিয়েছেন। তৃণমূলের মতামত নিলে আমিই মনোনয়ন পেতাম। এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ব। রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এস এম আরিফ অভিযোগ করে বলেন, তৃণমূলে প্রার্থী বাছাইয়ে গণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করা হয়নি। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশ থাকলেও বর্ধিত সভা ডেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কোনো মতামত নেয়া হয়নি। তৃণমূল নেতাদের মতামতের মূল্যায়ন না করেই ঢাকায় বসে দলের ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে বিএনপির দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। ফলে তাদের মতামতের ভিত্তিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করবো। আরিফ দাবি করেন, তার সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে রাজশাহীর বিভিন্ন পৌরসভায় একাধিক প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করবেন। শিগগিরই তারাও সংবাদ সম্মেলন করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের ঘোষণা দেবেন।
চট্টগ্রামের মিরসরাই পৌরসভায় রফিকুল ইসলাম ও বারৈয়ারহাটে মাইনুদ্দিন লিটন পেয়েছেন বিএনপির মনোনয়ন। দলীয় সূত্র জানায়, থানা ও পৌর বিএনপি মিরসরাইয়ে আনোয়ার হোসেন চৌধুরী ও বারৈয়ারহাটে দিদারুল আলম মিয়াজির নাম প্রস্তাব করেছিল। তারা সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, দলের সাবেক এক এমপির তদবির ও আর্থিক সুবিধার কাছে তারা হেরে গেছেন। দিদারুল আলম মিয়াজী বলেন, রাজনীতি করতে গিয়ে ২৩টি মামলার আসামি হয়েছে আর বিগত নির্বাচনে হেরে এলাকা ছেড়ে নিরাপদে দিন কাটিয়েছেন মাইনুদ্দীন। অন্যদিকে আনোয়ার হোসেন চৌধুরী স্বতন্ত্র নির্বাচনের কথা জানিয়ে বলেন, ভুল প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে দল। চার-পাঁচ হাজার লোক নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে সেটা প্রমাণ করে দেব। এদিকে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা পৌরসভার দলের মনোনয়ন পাননি বর্তমান মেয়র আবু ইউসুফ চৌধুরী। সেখানে মনোনয়ন পেয়েছেন বাদশা মিয়া। দলীয় সূত্র জানায়, খাগড়াছড়ির সাবেক এমপি আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়ার হস্তক্ষেপে মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন বর্তমান মেয়র। আগের দিন প্রত্যয়নকারী মো. শাহজাহানের সঙ্গে দেখা করেছিলেন ওয়াদুদ ভূঁইয়া। অথচ খাগড়াছড়ি বিএনপিতে তারা দুজন ছিলেন হরিহর আত্মা। ইউসুফ চৌধুরীর সমর্থকরা জানান, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়বেন তিনি।
মৌলভীবাজারের বড়লেখার বর্তমান মেয়র ফখরুল ইসলামের বদলে মনোনয়ন পেয়েছেন বিভক্ত পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলাম। যিনি কমিটিতে আসার কারণে সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন ৫৮ নেতাকর্মী। ফখরুলের সমর্থকরা জানান, নির্বাচনের ফলাফলেই প্রমাণ হবে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল। ওদিকে ফেনী সদর আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত সাবেক পৌর মেয়র নুরুল আবছার কিন্তু পেয়েছেন ফজলুল রহমান। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে ফেনীতে। জেলা বিএনপি সূত্র জানায়, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে থাকবেন নুরুল আবছার।
রাজবাড়ী পৌরসভার মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের বড় ছেলে অর্ণব নেওয়াজ মাহমুদ হৃষিত। তিনি পৌর বিএনপির ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য। এ নিয়ে বুধবার দুপুরে চেয়ারপারসন কার্যালয়ের সামনে বঞ্চিত প্রার্থীর সমর্থকরা খৈয়মের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। তারা অভিযোগে করেন পরিবারতন্ত্র মজবুত করতে খৈয়ম প্রভাব খাটিয়ে তার ছেলের মনোনয়ন নিশ্চিত করেছেন। এ ছাড়া গুলশান কার্যালয়ে বিক্ষোভ করেছেন নাটোরের গোপালপুর পৌর বিএনপির নেতাকর্মীরাও। একইভাবে ময়মনসিংহের গৌরীপুরসহ বেশ কয়েকটি পৌরসভায় মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায় বিএনপি প্রার্থী উমর ফারুক ছাড়াও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে চান মাহমুদ সরকার মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। সেখানে চান মাহমুদের কর্মী-সমর্থকরা ওমর ফারুক ও সাবেক এমপি শামসুদ্দিনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন। ফুলবাড়ীয়া উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ আহমেদ অভিযোগ করেন, খোলস পালটে জামায়াত-শিবিরের নেতা উমর ফারুক বিএনপির মনোনয়ন নিয়েছেন। দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ফুলবাড়ীয়া পৌর বিএনপির সভাপতি শমসের আলী অভিযোগ করেন, তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে মেয়র পদে মনোনয়ন দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন চেয়ারপারসন। কিন্তু তার এ নির্দেশ মানা হয়নি। দলছুট জামায়াত নেতার বিএনপির মনোনয়ন দলের রাজনৈতিক দৈন্যতার প্রতিফলন। ওদিকে বরগুনার বেতাগী পৌরসভায় বিএনপি সমর্থিত হুমায়ুন কবিরের পাশাপাশি বিদ্রোহী হিসেবে জাহাঙ্গীর আলম লাভলু ও কামরুজ্জামান মিলন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। হবিগঞ্জ সদরে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কারান্তরীণ পৌর মেয়র (সাময়িক বরখাস্ত) জি কে গউছ ছাড়াও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আমিনুর রশীদ এমরান ও ইসলাম তরফদার তনু এবং শায়েস্তাগঞ্জে বিএনপির ফরিদ আহমেদ অলির পাশাপাশি বিদ্রোহী হিসেবে হাজি মজিদ মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। খুলনার পাইকগাছায় বিএনপি মনোনীত অ্যাডভোকেট জি এম আবদুস সাত্তারের পাশাপাশি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জামায়াত নেতা অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ গাজী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। সিলেটের গোলাপগঞ্জে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া চৌধুরীর পাশাপাশি জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের আমিনুল ইসলাম আমিন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। কানাইঘাটে বিএনপির রহিম উদ্দিন ভরসার পাশাপাশি খেলাফত মজলিসের হাফিজ ইসলাম উদ্দিন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন জামায়াত নেতা ওলিউল্লাহ। জকিগঞ্জে বিএনপির অধ্যাপক বদরুল হক বাদল ও খেলাফত মজলিস থেকে জহুরুল হক মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় দুইজন ও পটিয়ায় একজন স্বতন্ত্র মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। রাঙ্গুনিয়ায় বিএনপির সাবেক পৌর মেয়র নুরুল আমিন তালুকদারও বিএনপি সমর্থক মফিজুল ইসলাম, পটিয়ায় দক্ষিণ জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক তৌহিদুল আলমের পাশাপাশি বিএনপি নেতা ইব্রাহীম সওদাগর মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। চন্দনাইশে শরীক দল এলডিপি’র প্রার্থীকে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। তবে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছেন ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন। বিএনপির জেলা পর্যায় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে দেড় শতাধিক পৌরসভায় স্বতন্ত্র নামে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে। তবে চেয়ারপারসনের নির্দেশনা মেনে তাদের বেশির ভাগই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন। বিএনপি নেতারা জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে পৌর নির্বাচনের সমন্বয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো কমিটি করা যায়নি। দলের যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহানের তত্ত্বাবধানে ও কয়েকজন সহ-সম্পাদকের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে। বিষয়টির সঙ্গে একমত পোষণ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অন্যতম নির্বাচনী সমন্বয়কারী গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, মনোনয়ন বোর্ড করে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এবং সুযোগ কোনোটিই পায়নি বিএনপি। নানাভাবে সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে তৃণমূলের সিদ্ধান্তে ত্রুটি রয়েছে। এ ছাড়া মনোনয়নবঞ্চিতদের তরফে নানা অভিযোগকে ভোটের রাজনীতিতে চিরাচরিত সংস্কৃতি। অনিয়মের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-প্রচার সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, বিএনপির হাইকমান্ডের সরাসরি তত্ত্বাবধানে জেলা বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপিদের পাঠানো প্রস্তাব যাচাই-বাছাই শেষে মেয়র প্রার্থীদের মনোনয়নের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়েছে। এখানে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।
মহিউদ্দিন জুয়েল, চট্টগ্রাম থেকে জানান, প্রার্থী মনোনয়নে তৃণমূলের সুপারিশ উপেক্ষা, প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠজনদের মনোনয়ন দেয়ার কারণে পৌরসভা নির্বাচন উপলক্ষে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগে জ্বলছে তুষের আগুন। ভোটের মাঠে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন চট্টগ্রামের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। দলীয় হাইকমান্ডের আদেশে সন্দ্বীপে আওয়ামী লীগ থেকে জাফর উল্লাহ টিটু, রাউজানে দেবাশীষ পালিত, রাঙ্গুনিয়ায় শাহজাহান সিকদার, সীতাকুণ্ডে শফিউল আলম, বারৈয়ারহাটে নিজাম উদ্দিন, পটিয়ায় অধ্যাপক হারুনুর রশিদ, বাঁশখালীতে সেলিম-উল হক, মিরসরাইয়ে গিয়াস উদ্দিন, চন্দনাইশে মাহবুবুল আলম খোকা ও সাতকানিয়ায় মোহাম্মদ জোবায়ের নির্বাচন করার জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ জানায়, মিরসরাই পৌরসভায় দলীয় মনোনয়নপত্র পেয়েছেন সেখানকার সভাপতি গিয়াস উদ্দিন। মনোনয়ন লড়াইয়ে বাদ পড়েছেন বর্তমান মেয়র এম শাহজাহান। যিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের একজন সদস্য। অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী বারৈয়ারহাট পৌরসভায় পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি নিজাম উদ্দিন মনোনয়ন পেয়েছেন। বাদ পড়েছেন বর্তমান পৌর মেয়র আবু তাহের। গিয়াস ও নিজাম গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় তাদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। সীতাকুণ্ডেও জেলা কমিটির সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে প্রার্থী করা হয়েছে শফিউল আলমকে। স্থানীয় এমপি দিদার তার জন্য সুপারিশ করেছেন বলে জানা গেছে। তবে এর মধ্যে সন্দ্বীপে জাফর উল্লাহ সাংসদের একজন ঘোরতর বিরোধী। রাউজানে প্রথমদিকে এমপি ফজলে করিমের অনুসারী শফিকুল ইসলাম বেবীর মনোনয়ন পাওয়ার কথা থাকলেও সিদ্ধান্ত ঘুরে তা দাঁড়িয়ে যায় জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক দেবাশীষ পালিতের দিকে। ভোটের মাঠে এ নিয়ে প্রভাব তৈরি হতে পারে বলে ধারণা স্থানীয়দের। পটিয়া পৌর মেয়র অধ্যাপক হারুনুর রশিদকে প্রার্থিতা করা নিয়েও ছিল দ্বিধাবিভক্তি। সাতকানিয়ায় জেলা আওয়ামী লীগ একক প্রার্থী হিসেবে মোহাম্মাদুর রহমানের নাম পাঠালেও কেন্দ্রে গিয়ে তা বদলে চলে গেছে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মো. জোবায়েরের পক্ষে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কথা হয় উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এম সালামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দলীয় এক প্রার্থীর জন্যই কাজ করবে তৃণমূল। অনেকে নির্বাচন করতে চেয়েছেন। কিন্তু সবাইকে তো নৌকা প্রতীক দেয়া যাবে না। তা ছাড়া বিএনপিও থাকছে। তাই বুঝে শুনে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, স্বতন্ত্র কিংবা বিদ্রোহী কোনো প্রার্থী আওয়ামী লীগ থেকে থাকছে না। বিষয়টি কঠোরভাবে বলা হয়েছে। যাদের চূড়ান্ত করা হয়েছে তারা ত্যাগী ও দলের জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করবেন বলে তিনি জানান।

Share

Author: 24bdnews

5310 stories / Browse all stories

Related Stories »

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুকে আমরা »

ছবি সংবাদ »

সংগঠন সংবাদ »

প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে নারায়ণগঞ্জে অধিকারের আলোচনা সভা

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ): মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এর ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নারায়ণগঞ্জে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (১০ অক্টোবর) বেলা ১১টায় শহরের কলেজ রোড এলাকায় অধিকার নারায়ণগঞ্জ ইউনিটির সমন্বয়ক…

নিউজ আর্কাইভ »

MonTueWedThuFriSatSun
   1234
12131415161718
19202122232425
2627282930  
       
1234567
891011121314
293031    
       
     12
10111213141516
17181920212223
24252627282930
       
  12345
13141516171819
20212223242526
2728293031  
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930 
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30      
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031 
       
   1234
12131415161718
262728    
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031    
       
    123
45678910
18192021222324
25262728293031
       
  12345
27282930   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
    123
11121314151617
252627282930 
       
 123456
28293031   
       
     12
3456789
10111213141516
24252627282930
31      
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031    
       
     12
17181920212223
24252627282930
       
  12345
2728     
       
      1
23242526272829
3031     
   1234
262728293031 
       
   1234
12131415161718
       
      1
3031     
29      
       
      1
16171819202122
30      
   1234
12131415161718
19202122232425
262728293031 
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930    
       
     12
17181920212223
24252627282930
31      
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
       
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
2425262728  
       
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
       

সবশেষ সংবাদ »

সারাদেশ »