তাদের কি কোনো বিবেক নেই ?

0
6

ঢাকা (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ): ‘আমাদের খুব খারাপ সময় যাচ্ছে। অনেক বড় দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি। তাই প্রচণ্ড শীতের মধ্যে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছি। রাস্তায় নামা ছাড়া আমাদের উপায় ছিল না। বিকেল ৪টা বাজে, এখনও দুপুরের খাওয়া হয়নি। আমরা গত পাঁচ দিন ধরে এখানে কত অসহায়ভাবে জীবনযাপন করছি, অথচ কেউ আমাদের বিষয় নিয়ে ভাবছে না। তাদের কি কোনো বিবেক নেই, মানবিকতার বিষয়টা নিয়েও তাদের কি ভাবনা নেই?’

এভাবেই সাংবাদিকদের কাছে ক্ষোভ ও দুঃখের কথা বলছিলেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আন্দোলনরত বেকার নার্স তামিমা আক্তার। তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিডফোর্ড নার্সিং ইনস্টিটিউট থেকে পাস করেছেন।

তিনি আরো বলেন, ‘এখন টাকা ছাড়া কোনো চাকরি হয় না। নিয়োগবাণিজ্য করার জন্যই তারা পরীক্ষার কথা বলছেন। পরীক্ষা তো নয়, এটা তাদের টাকা খাওয়ার ধান্দা। ১০/১২ লাখ টাকা দিয়ে চাকরি করার মতো অবস্থা আমাদের নেই।’

এ সময় আন্দোলনরত অনেককে ফুটপাতে বসে আলুর চিপস খেতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে খুলনা নার্সিং ইনস্টিটিউট থেকে ২০০৯ সালে পাস করা তন্বী সাহা জানান, তার দুপুরে খাওয়া হয়নি। তাই দুপুরের খাবার হিসেবে চিপস খাচ্ছেন।

তন্বী বলেন, ‘আমাদের বিষয়টা কতোটা অমানবিক, তা কেউই বুঝতে পারছে না। এ নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। তারা (সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা) বাসায় বসে আরাম-আয়েশে আছেন। আর এই প্রচ- শীতে আমরা দাবি আদায়ের জন্য রাস্তায় পেপার বিছিয়ে খেয়ে না-খেয়ে বসে আছি। তাদের বিবেক বলে কিছু আছে বলে মনে হয় না। আমরা কোনো অযৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছি না। এটা ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি। প্রতিশ্রুতি যখন দিয়েছেন, তাহলে কেন বাস্তবায়ন করবেন না? আমাদের জন্য কি তাদের মনে কোনো দয়া-মায়া নেই।’

বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ থেকে ২০০৭ সালে পাস করা মনিকা দেউড়ি বলেন, ‘জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে চাকরি পাবার আশায় নার্সিং পড়েছি। চার বছর ধরে ডিপ্লোমা করেছি। ২০০৭ সাল থেকে এখনও বেকার বসে আছি।’

নোয়াখালী থেকে আসা সুমী দাস পাস করেছেন ২০০৭ সালে। তিনি বলেন, ‘১০ বছর হয়ে গেল, এখনও চাকরি পেলাম না। নিয়ম অনুসাওে, ১০ বছর আগেই আমার চাকরি হওয়ার কথা। চাকরির আশায় বসে থেকে থেকে বয়স ৩২ বছর হয়ে গেছে। এখন অন্য কোনো সরকারি চাকরিতেও আবেদন করতে পারব না। আগে যদি জানানো হতো যে, পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পেতে হবে, তাহলে এই চাকরির আশায় বসে না থেকে অন্য চাকরির জন্য আবেদন করতাম। এখন তো সেই সুযোগ নেই। তাহলে আমরা কী করব?’

তিনি জানান, আন্দোলন শুরুর সময় সেবা পরিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক নিলুফার ফারহাদ ও আরেক কর্মকর্তা এখানে এসে বাসায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, আমাদের বিষয়টি তারা দেখবেন। ঠিক পরের দিন আবার তিনি আমাদের জানান, তাদের কিছুই করার নেই। পিএসসির সামনে গিয়ে আন্দোলন করার পরামর্শ দেন তারা।

বগুড়া থেকে আসা জিয়াউর রহমান জানান, প্রায় সাড়ে ৩ হাজার বেকার নার্স চাকরির নির্ধারিত বয়সসীমা অতিক্রম করেছেন। ২০০৬ সালে পাস করা ছেলেমেয়েদের অর্ধেক নিয়োগ পেলেও বাকি অর্ধেক নিয়োগ পাননি।

বেকার ডিপ্লোমা নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনে মহাসচিব ফারুক হোসাইন জানান, সর্বশেষ ২০১৩ সালে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ৪ হাজার ১০০ নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়।

সিলেট থকে আসা সুজন মীর বলেন, প্রায় ১৮ হাজার বেকার নার্স রয়েছে। এর ৯৫ শতাংশই নারী। অবস্থান কর্মসূচিতে অন্তত ২ হাজার জন অংশ নিয়েছেন। আন্দোলনরত নারীরা শীতে রাস্তায় খোলা জায়গায় যেভাবে কষ্ট করছেন, এটা সরকারের বোঝা উচিত। তিনিও তো নারী। আমি আশা করি, তিনি হয়ত নারীদের অর্থাৎ বেকার নার্সদের বিষয়টি বিবেচনা করবেন।

বেকার নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রিনা আকতার বলেন, সবাই মৌখিক আশ্বাস দিচ্ছেন। কিন্তু কেউ লিখিতভাবে কিছু বলছেন না। তাই তারা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।

জানা যায়, ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রী ১০ হাজার নার্সের পদ সৃষ্টির ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে সচিব কমিটি এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সরকারি চাকরিপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে নার্সদের বয়স ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৬ বছর করার অনুমোদন দেওয়া হয়।

গত ৮ ডিসেম্বর মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে নার্সিং পেশার সার্বিক অগ্রগতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত একটি বৈঠক হয়। ১০ ডিসেম্বর জারিকৃত সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি উপেক্ষা করে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন কর্তৃক পরীক্ষার মাধ্যমে  ২০১৫ সালে ২২ ডিসেম্বরের মধ্যে নার্স নিয়োগের প্রথম স্তরের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারির সিদ্ধান্ত হয়। এরপর থেকে আন্দোলনে নামেন বেকার নার্সরা।

গত ১৯ জানুয়ারি সকাল ১০টা থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন শুরু করেন বেকার নার্সরা। পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাতিল, চাকরির বয়স ৩৬ করা, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নিয়োগের দাবিতে বাংলাদেশ বেকার নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন এ কর্মসূচি পালন করছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here