নির্বাচনে ‘আস্থাহীন’ হয়ে পড়ছে জনগণ

0
4

ঢাকা (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ): নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভীতিকর পরিস্থিতির কারণে আস্থাহীন হয়ে পড়ছে জনগণ। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের অবস্থান নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করছে কেউ কেউ। আবার কেউ নির্বাচন কমিশনের সমালোচনাও করেন।

তাদের দাবি, দুই দলই তাদের নিজেদের জনপ্রিয় দাবি করেন। কিন্ত বাস্তবতার নিরীখে জনকল্যাণে তাদের অবস্থান কতটা পরিষ্কার তা স্পষ্ট নয়। কারণ ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি না এলেও রাজপথের আন্দোলনে জনগণের ভূমিকা চোখে পড়েনি। দলীয় সরকারের অধীনে উপজেলা নির্বাচন, সিটি নির্বাচন, সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। তাতে জনগণ সাড়া দিলেও নজিরবিহীন ভোটের কারণে তাদের মধ্যে আস্থাহীনতার কথাই ব্যক্ত করেন।

ঠাকুরগাঁও সদর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, ‘ভোটারের কোনো মূল্য নেই। ভীতিকর পরিস্থিতি, সরকার দলীয় মেয়র প্রার্থীর সমর্থকেরা দল বেঁধে মহড়ায় মানুষের মাঝে ছিল ভয়। আমাদের মধ্যে একটা ভয় কাজ করেছে। সাধারণ ভোটাররা তো আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভোট দিতে যাবে না। আমি মরতে যাব না কি?’

‘কেউ কেউ জীবনবাজি রেখে ভোট দিতে আসেন এটাকে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বুঝায় না,’ মন্তব্য করেন তিনি।

গাজীপুর শ্রীপুর পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার সারোয়ার হোসেন রুবেল বলেন, ‘বিএনপির-জামায়াতের হরতাল, অবরোধের মত হয়ে গেছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন। তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকার পরও কাজে লাগাতে পারছে না। ফলে মানুষের মধ্যে নতুন করে ভীতি তৈরি করেছে। যা গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত। গণতন্ত্রমনা মানুষ হতাশ হয়েছেন। গণতন্ত্র আরেকবার পা পিছলে পড়ে গেল।’

যশোর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মতিনুজ্জামান বলেন, ‘এই নির্বাচনকে ঘিরে সরকারের প্রতি জনগণের যে আস্থা তৈরি হয়েছিল তা অনেকটাই ধূলিসাৎ হয়েছে। এতে সরকারের প্রতি জনগণের বিশ্বাস আবারও ফিরিয়ে আনতে তাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে।’

ভবিষৎতে সরকার কোনো নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে আস্থার সংকটে পড়তে পারেন বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।

পৌর নির্বাচনে ফলাফলে ব্যাপক ভরাডুবি হলেও বিএনপি নেতারা এটাকে তাদের রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছেন। দলের নেতারা এমনটাই দাবি করেছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল(অব.) মাহবুবুর রহমান বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘পৌর নির্বাচনে আমাদের মোরাল(নৈতিক)অর্জন আছে। মেটেরিয়াল(বস্তুগত) অর্জন জিরো।’

তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচনের মাধ্যমে নৈতিক অর্জন হচ্ছে-দলগতভাবে নেতাকর্মীরা নতুন উদ্যমে জেগে উঠেছে। ৮ বছর পর ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন হয়েছে। মানুষ তো ভুলেই গেছিল। নেতাকর্মীরা গর্তে ঢুকে গিয়েছে। সরকারের জুলুম অত্যাচার নির্যাতন, ঝড়-ঝপটা পেরিয়ে নেতাকর্মীরা মাঠে নেমে আসেন। বিএনপি জেগে উঠেছে।’

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, ২৩৪ পৌরসভার মধ্যে ঘোষিত ২০৬টির ফলাফল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের ৭ মেয়র প্রার্থীসহ নৌকা প্রতীকের ১৬০ মেয়রপ্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন, বিএনপি মনোনীত মাত্র ২৩ জন বিজয়ী হয়েছেন ও জাতীয় পার্টি পেয়েছে একটি ও নিবন্ধনহীন জামায়াতের দু’জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মেয়র হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন। এছাড়া পাঁচজন স্বতন্ত্র এবং অন্যান্য দলের ১৫ প্রার্থী মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘৫ জানুয়ারি কোনো নির্বাচনই হয়নি। এই নির্বাচনে(পৌর নির্বাচন) তারা (ক্ষমতাসীনরা)সেটা আবার প্রমাণ করেছে। নির্বাচন কমিশন, ছাত্রলীগ, যুবলীগ যেভাবে ভোট ছিনিয়ে নিয়েছে তাতে আমাদের রাজনৈতিক জয় হয়েছে।’

‘পৌর নির্বাচন দখল করে মেয়র হয়েছে, ভোটের মাধ্যমে মেয়র হতে পারেনি ক্ষমতাসীনরা,’ বলেন তিনি।

গুলশানে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পৌর নির্বাচনের পরবর্তী দলের অবস্থান তুলে ধরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, ‘বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট গতকাল (বুধবার) অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচন-২০১৫ এর ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। একইসঙ্গে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতারণা করা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য নির্বাচন কমিশন ও সরকারের পদত্যাগ দাবি করছে।’

‘আমরা (বিএনপি) রাজনৈতিকভাবে জয়ী হয়েছি। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে যে পরিস্থিত সৃষ্টি করেছিল, সেই অবস্থা থেকে নেতাকর্মীরা বেরিয়ে এসে জনগণের সঙ্গে মিলিত হতে পেরেছিল,’ বলেন মির্জা ফখরুল ।

নির্বাচনে পরাজয়ের ফলে নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করবে কিনা এমন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কোনো হতাশা তৈরি করবে না বরং আরও উদ্দীপ্ত করবে। নেতাকর্মীরা আবারও সংগঠিত হতে পেরেছে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পেরেছে।’

ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার ব্যাপারে সাংগঠনিক দুর্বলতা আছে কী না এমন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা কিছুতেই ফুটে উঠেনি। এখানে প্রমাণ হয়েছে সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মিজানুর রহমান শেলী বলেন, ‘দৃশ্যত এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় হয়েছে, বিএনপির পরাজয় হয়েছে। তবে বিরোধীদলগুলো ভোট কারচুপির যে অভিযোগ তুলেছে তা যদি সত্য হয় তাহলে ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের জন্য সংকট তৈরি হবে। কারণ গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো নির্বাচন।’

তিনি বলেন, ‘সহিংসতার মধ্যে ভোটকেন্দ্রে মানুষ যাবে না। তারাই স্বেচ্ছায় যোগ দিবেন যারা সরাসরি রাজনৈতিক সুবিধাভোগী। জনগণ ভোট দেওয়া থেকে উদাসীন হবে, আস্থাহীনতা তৈরি হবে। এটা গণতন্ত্রের জন্য খুব একটা মঙ্গলজনক হবে না।’

আওয়ামী লীগও দাবি করেছে, এ নির্বাচনে তাদের রাজনৈতিক অর্জন অনেক। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ রাজনৈতিক অর্জনে কথা জানান।

পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে কি কি অর্জন দেখছে’ এমন প্রশ্নের জবাবে হানিফ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অর্জন অনেক। তার মধ্যে যে রাজনৈতিক দল বিএনপি যারা এই সরকার এবং নির্বাচন কমিশন এই দুইজনকেই মানে না। সেই বিএনপি এদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রমাণ করেছে, এটি একটি বৈধ সরকার এবং এই ইসির অধীনে তারা নির্বাচন করতে পারে।’

হানিফ বলেন, ‘বিএনপি তো এ নির্বাচনকে নিয়েছিল একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে। বিএনপি যদি নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিত তাহলে তাদের সকল পর্যায়ের নেতারা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিত। এটা তাদের সুযোগ ছিল। কিন্তু তারা অংশ নেয় নাই।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here