সোনারগাঁয়ে কেন্দ্র দখলের মহোৎসব

0
3

নারায়ণগঞ্জ (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ): সব কিছুই ঠিকাঠাক চলছিল। লাইনে ভোটারও ছিল পর্যাপ্ত। কিন্তু বেলা ১১টায় মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে পাল্টে যেতে থাকে পরিস্থিতি। ওই সময় ভোটাররা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেলে আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থীদের কর্মী সমর্থকরা কেন্দ্র দখল করে প্রকাশ্যে ব্যালট পেপারে সীল মারা শুরু করে। ঘটনার প্রতিবাদ করলে তাদের হাতে লাঞ্ছিত হয় বিএনপি এবং আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের কর্মী সমর্থকরা। শুধু তাই নয়, সরকার দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে নেতা কর্মীরা প্রকাশ্যে সীল মারার উৎসবে মেতে উঠলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিরব ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। যেন তারা অসহায়। সাংবাদিকরা গিয়ে হাতে নাতে নৌকা প্রতীকে সীল মারা ব্যালট বইসহ সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারদের ধরলেও তারা সাংবাদিকদের কাছে তাদের অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে বলেছে তাদের কিছুই করার নেই। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কোন সহায়তা করছে না।
জামপুর ইউনিয়নে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শাহ মোঃ হানিফের পক্ষে জাতীয় পার্টির এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা প্রভাব বিস্তার করেছেন বলে অন্যান্য চেয়ারম্যান প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন। যোগাযোগ করা হলে স্থানীয় এমপি লিয়াকত হোসেন খোকাও স্বীকার করেন তিনি জামপুরেই অবস্থান করছেন।
এদিকে কেন্দ্র দখল, ভোটারদের চেয়ারম্যান পদে প্রকাশ্যে ভোট দিতে বাধ্য করা এবং কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেবার অভিযোগ এনে সোনারগাঁও উপজেলার ৩ ইউনিয়নের বিএনপি প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। গতকাল দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত ওই ৩ প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তারা হলেন-পিরোজপুর ইউনিয়নের বিএনপি প্রার্থী এবং বর্তমান চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম, সাদিপুর ইউনিয়নের বিএনপি প্রার্থী কামরুজ্জামান মাসুম এবং কাঁচপুর ইউনিয়নের বিএনপি প্রার্থী ফজলুল হক। এ ৩ প্রার্থীই সরকার দলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্র দখল, পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়া এবং ভোটারদের চেয়ারম্যান পদে প্রকাশ্যে ভোট দিতে বাধ্য করার অভিযোগ আনেন।
অপর দিকে নির্বাচনে ভোট গ্রহণের শেষ সময়ে বৈদ্যের বাজার ইউনিয়নের একটি কেন্দ্র থেকে আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য রুবায়েত হোসেন শান্তকে পুলিশ পিস্তলসহ আটক করে। কিন্তু পিস্তলটি বৈধ হওয়ায় পুলিশ তাকে ছেড়ে দিলেও তার অস্ত্রটি পুলিশ হেফাজতে নিয়ে নেয়। সোনারগাঁও থানার ওসি শাহ মঞ্জুর কাদের বলেন, অস্ত্রটি বৈধ হলেও নির্বাচন আচরণ বিধি অনুযায়ী নির্বাচনের দিন কেউই বৈধ অস্ত্রও বহন করতে পারেন না।
ওদিকে শনিবার সকালে পিরোজপুর ইউনিয়নের মেঘনা শিল্পাঞ্চল স্কুল এ- কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে সেখানে নারী-পুরুষ উভয় লাইনে ভোটারদের ভীড়। একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে একই ইউনিয়নের ঝাউচর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও। কিন্তু বেলা ১১টার দিকে বৃষ্টি শুরু হলে দ্রুত পাল্টে যেতে থাকে পরিস্থিতি। বৃষ্টির কারণে ভোটাররা লাইন থেকে সরে গেলে সেই সুযোগকে কাজে লাগায় সরকার সমর্থিত প্রার্থীদের কর্মীরা। পিরোজপুর ইউনিয়নের তাহেরপুর হাজী লাল মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সেখানে নৌকা প্রতিকের সমর্থকরা প্রকাশ্যে ব্যালট বইয়ে সীল মারছেন। কেন্দ্রটির ৬ নম্বর মহিলা বুথে গিয়ে দেখা যায়, সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার মাহাবুবুর রহমান নৌকা প্রতীকে সীল দেওয়া ব্যালট বই নিয়ে বসে আছেন। শুধু নৌকা প্রতিকেই নয়, তার কাছে থাকা মেম্বার এবং মহিলা মেম্বারদের ব্যালট বইয়েও সীল মারা। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাই আমরা পরিস্থিতির শিকার।’ কেন্দ্রের পিজাইডিং অফিসার আবদুস সাত্তার খবর পেয়ে ওই বুথে ছুটে গেলেও তিনি এ ব্যাপারে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। ওই সময় ভ্রাম্যমান আদালতের বিচারক ঢাকার এসিল্যান্ড আসিফ ইকবালকে সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রটিতে প্রবেশ করেন সোনারগাঁও থানার ওসি (তদন্ত) হারুন অর রশিদ। উভয়কে সীল মারা ব্যালট বই দেখানোর পরেও তারা এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নেননি। উল্টো বলেন, আপনারা ভোট নিতে থাকেন।
ওই কেন্দ্রের পাশের কেন্দ্র দুদঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল সাড়ে ১১টায় ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পুরুষ মেম্বার প্রার্থীর একশ পাতার একটি ব্যালট বই প্রকাশ্যে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে মোরগ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মুজিবুর রহমানের সমর্থকরা ব্যালট বইটি ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ কারণে কেন্দ্রের পিজাইডিং অফিসার আবুল হোসেন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ভোট গ্রহণ স্থগিত করে দেন। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশে ছিনতাই হওয়া ব্যালট বই উদ্ধার ছাড়াই ২ ঘন্টা পর দুপুর দেড়টায় আবারো ভোট গ্রহণ শুরু হয় বলে তিনি জানিয়েছেন।
এদিকে সন্মান্দি ইউনিয়নে বিএনপি বা জাতীয় পার্টির কোন চেয়ারম্যান প্রার্থী না থাকলেও এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৩ জনই ছিলেন আওয়ামীলীগ নেতা। এ ইউনিয়নের নীলকান্দা নাজিরপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ঈমানেরকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আওয়ামীলীগ প্রার্থীর কর্মী সমর্থকরা দখল করে প্রকাশ্যে সীল মারে। ওই সময় আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কর্মী সমর্থকদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। আওয়ামীলীগ প্রার্থীরা প্রকাশ্যে সীল মারা ছবি তুলতে গিয়ে নাজিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকার সমর্থিতদের হাতে মহসিন নামে একটি জাতীয় পত্রিকার সাংবাদিক লাঞ্ছিত হয়েছেন। এছাড়া এ ইউনিয়নের নানাখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র আওয়ামীলীগ নেতা কর্মীরা দখলের চেষ্টা করলে পুলিশ ৩ রাউ- ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
জামপুর ইউনিয়নে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান প্রার্থী শাহ মোঃ হানিফের পক্ষে প্রকাশ্যে সীল মারার অভিযোগ রয়েছে। এ ইউনিয়নের মহজমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জাতীয় পার্টির নেতা কর্মীরা কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করে। এছাড়া এ ইউনিয়নের ওটমা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কলতাপাড়া সিনিয়র মাদ্রাসা, বাসাবো টিলাব সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পাকুন্দা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দখলের চেষ্টা করা হয়। জামপুর ইউনিয়নে জাতীয় পার্টির প্রার্থী থাকায় স্থানীয় এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা সেখানেই অবস্থান করেছেন নেতা কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে।
সোনারগাঁও থানার ওসি শাহ মঞ্জুর কাদের বলেন, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণ ভাবে নির্বাচন শেষ হয়েছে। এ উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে গতকাল ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯টিতে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিল। এছাড়া ২টি জাতীয় পার্টির এবং ১০টিতেই আওয়ামীলীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here