সরঞ্জাম ও শ্রমিক সঙ্কটে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার জট

0
7

চট্টগ্রাম (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ) : আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত সরঞ্জামাদি (ইক্যুইপমেন্ট) ও শ্রমিক স্বল্পতার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে ধারণক্ষমতার চেয়ে অধিক সংখ্যক কন্টেইনার জমা পড়ে আছে। এর ফলে সৃষ্ট কন্টেইনার জটে বিপাকে পড়েছেন বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে জানা গেছে, বন্দর ইয়ার্ডের ৭০ শতাংশ স্থানে কন্টেইনার রাখা হয়। আর যন্ত্রপাতি ব্যবহারের জন্য খালি রাখা হয় বাকি ৩০ শতাংশ ভূমি। এই বন্দরের ইয়ার্ড ২৬ হাজার ৮৫৭ টিইইউস ধারণক্ষমতা সম্পন্ন হলেও বর্তমানে সেখানে ২৭ হাজার ৭৩৫ টিইইউস রয়েছে। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার চেয়ে ৮৭৮ টিইইউস কন্টেইনার বেশি রাখা হয়েছে এ বন্দরের ইয়ার্ডে।
একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরে খালি কন্টেইনারের ধারণক্ষমতা প্রায় সাড়ে ৫ হাজার হলেও এর পরিবর্তে রাখা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার খালি কন্টেইনার। এই অবস্থায় বন্দর ইয়ার্ডে স্থান সংকুলান না হওয়ায় মাদার ভেসেল থেকে কন্টেইনার খালাসের পরিমাণও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এতে বন্দরের বহির্নোঙরে আমদানি পণ্যবোঝাই মাদার ভেসেলের সারিও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আর জাহাজ থেকে কন্টেইনার নামাতে ধীরগতি এবং বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে থাকা কন্টেইনার দেরিতে খালি করার কারণে বিপাকে পড়েছেন পণ্য আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকেরা।
বন্দর থেকে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যমতে, মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে বহির্নোঙরে ৪৬টি জাহাজ পণ্য খালাসের অপেক্ষায় ছিল। এ ছাড়া বন্দর জেটিতে ২৪টি জাহাজ পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। বন্দরে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে ইয়ার্ডে কন্টেইনার এবং বহির্নোঙরে জাহাজ জটের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, গত মে থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে কন্টেইনারবোঝাই জাহাজগুলোকে দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। জেটিতে জাহাজের কন্টেইনার ডিসচার্জিংসহ লোড ও আনলোডে বিভিন্ন সমস্যা থাকায় সময় ক্ষেপণ হচ্ছে। যথা সময়ে পণ্য খালাস করতে না পারায় জেটিতে কন্টেইনার জট দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে জেটিতে কন্টেইনার ও বহির্নোঙরে জাহাজ জটের সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থানকাল বেড়েছে ৫ থেকে ৭ দিন।
গত মঙ্গলবার বন্দর ঘুরে দেখা যায়, অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালনায় ২৬টি কি-গ্যান্ট্রি ক্রেনের প্রয়োজন থাকলেও রয়েছে মাত্র চারটি। রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেনের ৫২টির স্থলে রয়েছে মাত্র ২১টি। স্টেডল কেরিয়ার ৩৯টির স্থলে রয়েছে ৩৬টি। অ্যাম্পটি হ্যান্ডলার ৩৯টির মধ্যে রয়েছে মাত্র ১৯টি। ট্রাক্টর ট্রেইলর ১৩০টির স্থলে রয়েছে মাত্র ৪৩টি। এ ছাড়া কন্টেইনার ওঠা-নামানোর জন্য যেখানে ২৯৯টি যন্ত্রপাতি প্রয়োজন, সেখানে রয়েছে মাত্র ৮৭টি। কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের ৮৯৫টি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির মধ্যে রয়েছে মাত্র ২৮৫টি।
আমদানিকারকদের অভিযোগ, জাহাজ থেকে কন্টেইনার খালাসের পর ইয়ার্ডে রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকায় উৎপাদনশীলতা অনেক কমেছে। পণ্য খালাসপ্রক্রিয়াও গড়ে ১৫ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বিত হচ্ছে। এতে বহির্নোঙরে জাহাজের গড় অবস্থানকাল বেড়ে যাওয়া ব্যয়ও বাড়ছে।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম-সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম বলেন, এনসিটি ও সিসিটি এলাকায় প্রতিদিন গড়ে হাজারের বেশি কন্টেইনার ডেলিভারি হয়। এতে প্রতিদিন ৮ থেকে ৯ হাজার শ্রমিক দরকার হলেও বর্তমানে এক থেকে দেড় হাজারের মতো শ্রমিক দিয়ে কাজ চালাচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ফলে কন্টেইনারের পণ্য খালাস করতে বেশি সময় লাগছে।
তিনি বলেন, বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমের বর্তমান যে অবস্থা তাতে ভিশন ২০২১ থেকে অনেক পিছিয়ে আছি। ২০২১ সালের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রাইভেট আইসিটিগুলোর অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়ানো ও দক্ষ শ্রমিক দিয়ে ডেলিভারি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
শিপিং এজেন্টরা জানান, ইয়ার্ড থেকে কন্টেইনার খালাস চলছে ধীরগতিতে। এতে জাহাজ থেকে ইয়ার্ডে কন্টেইনার নামানোর কাজও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে প্রত্যেক জাহাজকে অতিরিক্ত ২ থেকে ৪ দিন বেশি সময় জেটিতে থাকতে হচ্ছে।
শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক ওয়াহিদ আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে এনসিটিতে সবচেয়ে বেশি অপারেশন হয়। কিন্ত এই টার্মিনালে জাহাজ আসা যাওয়ার জন্য মাত্র একটি গেট চালু রয়েছে। গেট বাড়ানো না হলে কন্টেইনার জটের সমস্যা কাটবে না।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পোর্ট ইউজার্স ফোরামের বৈঠকে অপারেশনাল কার্যক্রমে গতি না বাড়ালে বন্দরে আরো ভয়াবহ কন্টেইনার জটের সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা করা হয়। এ ছাড়া ওই বৈঠকে পোশাক প্রস্তুতকারী ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ বিরাজমান সমস্যা সমাধানে প্রস্তাবনা দেয়। একই সঙ্গে বন্দরের ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি ও ইয়ার্ডভিত্তিক পর্যাপ্ত সরঞ্জাম স্থাপন করা না হলে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয় বলে জানান তারা।
বিজিএমইএ জানায়, দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বর্ণদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। এ বন্দর দিয়ে দেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ পরিবাহিত হয়।
এদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি হচ্ছে, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০১৫ সালে ২০ লক্ষ ২৪ হাজার ২০৭ টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি।
সূত্র জানায়, বন্দরে বর্তমানে ২০ লাখের বেশি টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করছে। তবে এ পরিমাণ কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য যে ধরনের সরঞ্জাম প্রয়োজন তা নেই।
শিপিং এজেন্ট, বার্থ অপারেটর ও বিকডা সূত্রে জানা যায়, বন্দরে হ্যান্ডলিং কার্যক্রম যেভাবে বেড়েছে সে অনুযায়ী অবকাঠামোগত সুবিধা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বাড়েনি। এ ছাড়া হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতিগুলো অনেক পুরোনো ও জরাজীর্ণ হওয়ায় ঘন ঘন বিকল হচ্ছে। বিশেষ করে স্ট্রেডল ক্যারিয়ার ও আরটিজির অবস্থা খুবই খারাপ।
এনসিটি ইয়ার্ডে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের জন্য ২২টি রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেনের স্থলে রয়েছে মাত্র ১০টি। তাও অধিকাংশই থাকে বিকল। সিসিটি ইয়ার্ডে ১১টি গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলো প্রায় সময় বিকল থাকে। বর্তমানে জেনারেল কার্গো বার্থে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ৪০ ভাগ দিয়ে কার্যক্রম চলছে। অকেজো যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য ওয়ার্কশপও বহুদিন ধরে পড়ে আছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা বাড়লেও যন্ত্রপাতি স্বল্পতায় বন্দরে হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে উৎপাদনশীলতা ক্রমেই কমছে।
বন্দরের এ অবস্থায় বিজিএমইএ বলছে, এনসিটি, সিসিটি ও জেনারেল কার্গো বার্থে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের জন্য আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ভাড়ার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংস্থাপন করা যেতে পারে।
বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, পোশাকশিল্পের উন্নয়নসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বন্দরের অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম বলেন, জাহাজ ও কন্টেইনার জটের জন্য পোশাকশিল্প মালিকরাই দায়ী। কন্টেইনার জট কমাতে আরো দুটি নতুন কন্টেইনার ইয়ার্ড নির্মাণ হচ্ছে। এ ছাড়া জাহাজের জট কমাতে রাত্রিকালীন জাহাজ চলাচল চালু হয়েছে, যা আগে ছিল না।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here