বেসরকারি উচ্চ শিক্ষা মহাসঙ্কটে

0
6

ঢাকা (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ) : ১২ কারণে গভীর সংকটে পড়েছে দেশের বেসরকারি উচ্চ শিক্ষা। শিক্ষার মান, দক্ষ শিক্ষকের অভাব, বিশ্ববিদ্যালয় আইন না মানা, ইচ্ছে মতো আউটার ক্যাম্পাস খুলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালনা, মালিকানা দ্বন্দ্ব, উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব, তথাকথিত কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের বেপরোয়া সনদ বাণিজ্য, পরিবেশের অনুপস্থিতিসহ বেশ কয়েকটি ইস্যুতে অর্ধযুগ থেকেই বিতর্কের জন্ম দিয়ে আসছে সিংহভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
শিক্ষার মান নিশ্চিতসহ উচ্চ শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সূচকে হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ভালো অগ্রগতি আনতে সক্ষম হলেও সম্প্রতি ‘জঙ্গি’ সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার প্রেক্ষাপটে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জঙ্গি সংশ্লিষ্টতায় বেসরকারি নর্থনাউথসহ বেশ কয়েকটি নামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আলোচনায় উঠে আসে। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি উচ্চশিক্ষায় সরকারি পর্যবেক্ষক নিয়োগ, নতুন করে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের আউটার ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থার অভাব, ইউজিসির কড়া মনিটরিং, স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব কারণে বেসরকারি উচ্চ শিক্ষা গভীর সংকটে পড়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বছর শিক্ষার্থী ভর্তি কমে যেতে পারে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায়। নাম না প্রকাশের শর্তে নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষা উদ্যোক্তা বলছেন, বিদ্যমান এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা মুখ ফিরিয়ে নেবে। এতে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বাড়বে। দেশের টাকা চলে যাবে দেশের বাইরে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পুরনো সমস্যা ও নতুন তৈরি হওয়া সংকট দূর করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) গৃহীত পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির কোনো কোনো কর্মকর্তাই নানাভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুবিধা গ্রহণ করছেন। ফলে এ দুটি প্রতিষ্ঠানের গৃহীত ব্যবস্থাও কার্যকর হয় না। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষা ব্যবস্থা দিন দিন বাণিজ্যের পথে পা বাড়াচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় আইন না মেনে বেসরকারি উচ্চশিক্ষার ব্যবসায় নেমেছেন এক শ্রেণির ব্যবসায়ী। পাশাপাশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সংকটের মধ্যে নতুন করে ‘জঙ্গি’ তৈরির কারখানা বানানো হয়েছে। সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলায় দেশের প্রথম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থসাউথের বেশ কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর নাম উঠে আসে। যাতে বড় ধরনের ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। এর প্রভাব পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির স্বাভাবিক কার্যক্রমেও। বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন বিভাগে স্নাতক শ্রেণিতে গত ২৩ জুলাই ফল সেমিস্টারে ভর্তি পরীক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে ৬ আগস্ট করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, আবেদনকারীর সংখ্যাও এবার আগের চেয়ে কম। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দীর্ঘমেয়াদি এর প্রভাব পড়তে পারে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকদের সংগঠন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেন, ‘জঙ্গিবাদ’ সমস্যা শুধু বাংলাদেশে নয়; বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোতেও একই সমস্যা। এই সমস্যা বিশ্বব্যাপী। জঙ্গি হামলায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততা থাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। শিক্ষার মান রক্ষা করতে না পারলে সবাই মুখ ফিরিয়ে নেবে এটাই স্বাভাবিক। তবে মান অর্জন করার চেষ্টার মধ্যে ‘জঙ্গি’ ও ‘উগ্রবাদ’ মোকাবিলার নতুন চ্যালেঞ্জ শুরু হয়। ‘জঙ্গিবাদ’ প্রবণতার বিষয়টি যেহেতু যুবক সমাজের মধ্যে প্রবেশ করেছে সেহেতু এই সংকট নির্মূলে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এখন এই তরুণ প্রজন্মের বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ ব্যাপারে ইউজিসির চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান বলেন, সাম্প্রতিক জঙ্গি ইস্যুতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন। আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট যে, যারা বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে ব্যর্থ হবে তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধসহ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সমস্যায় জর্জরিত ১১ বিশ্ববিদ্যালয় : নানা সমস্যায় জর্জরিত দেশের ১১ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে বলেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। সরকারি এ সংস্থাটি বিদেশি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রেও একইভাবে সাবধান থাকতে ছাত্রছাত্রীদের পরামর্শ দিয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি গণবিজ্ঞপ্তি ইতিমধ্যে জারি করা হয়েছে। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় বা ক্যাম্পাসে কোনো ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়ে যাতে প্রতারিত না হয় সে জন্য এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এরপরও কেউ যদি চিহ্নিত বিশ্ববিদ্যালয় বা তার ক্যাম্পাসে ভর্তি হয়, তাহলে তার দায় দায়িত্ব সরকারের নয়। তিনি বলেন, বিদেশি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনও এখন পর্যন্ত সরকার দেয়নি। তাই শিক্ষার্থীরা যেন এ ধরনের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়, সে পরামর্শও আমাদের থাকবে। ইউজিসি সূত্র জানায়, ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৬টি ক্যাটাগরি আছে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এসেছে সেগুলো হলো- ইবাইস, আমেরিকা-বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, কুইন্স ইউনিভার্সিটি, বিজিসি ট্রাস্ট, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস, ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগাং, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, নর্দান ইউনিভার্সিটি, আন্তর্জাতিক ইসলামী ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ব্রিটানিয়া ইউনিভার্সিটি ও দারুল ইহসান। ৬ ক্যাটাগরির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আউটার ক্যাম্পাস পরিচালনাকারী। ইতিমধ্যে আদালত এ ধরনের ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করেছে। এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আছে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি। এটি শুধু আউটার ক্যাম্পাস নয়, অননুমোদিত ক্যাম্পাস পরিচালনার দায়েও অভিযুক্ত। আন্তর্জাতিক ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব চিটাগাং যদিও আউটার ক্যাম্পাস চালাচ্ছে না বলে ইউজিসিকে জানিয়েছে। কিন্তু তাদের বেশ কয়েকটি অননুমোদিত ক্যাম্পাস আছে বলে ইউজিসি জানায়। সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগাং, কুইন্স ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সের আউটার ক্যাম্পাস আছে। আমেরিকা-বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি কয়েকটি ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত। এটি সরকার কর্তৃক বন্ধ ঘোষিত। আদালতের রায় নিয়ে চলছে। কিন্তু তারা সারা দেশে ১৬টি অবৈধ আউটার ক্যাম্পাস চালাচ্ছে। ইবাইস ইউনিভার্সিটিও কয়েকটি ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত। এর মধ্যে আছে মালিকানা (বিওটি) দ্বন্দ্ব ও অননুমোদিত ক্যাম্পাস পরিচালনা। সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ব্রিটানিয়া ইউনিভার্সিটির মালিকানা (বিওটি) দ্বন্দ্ব আছে। এগুলো জেনে বুঝে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
ভর্তিতে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা : এদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলতি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির ধারাবাহিক বৃদ্ধিতে ছেদ পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষাবিদরা। শিক্ষার গুণগতমানের অভাবের পাশাপাশি সাম্প্রতিক জঙ্গি ইস্যুকে এর বড় কারণ বলে মনে করছেন তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ‘জঙ্গি’ সম্পৃক্ততার প্রমাণ থাকার ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে। এতে কারো দ্বিমত করার সুযোগ নেই। যার প্রভাব ভর্তিতে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। ফলে শিক্ষার্থী ভর্তি হবে কম। বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকরাও সন্তানের শিক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছেন। এটি দেশের উচ্চশিক্ষার জন্য একটি গভীর সঙ্কট। এটিকে হালকাভাবে দেখলে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ৭৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ১ লাখ ২১ হাজার ১৯৪ শিক্ষার্থী। যদিও ওই বছর মোট আসন ছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার ২টি। এ হিসাবে ২০১৪ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন খালি ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৮০৮টি, যা মোট আসনের ৪৮ শতাংশ। ২০১৩ সালে মোট ২ লাখ ১৪ হাজার ৩৬৯টি আসনের বিপরীতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তি হন ১ লাখ ১৯ হাজার ৭৬৫ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ ওই শিক্ষাবর্ষে আসন খালি ছিল ৪৪ শতাংশ। এ ছাড়া ২০১২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তি হন ৮১ হাজার ৪৩০ জন, ২০১১ সালে ৬৯ হাজার ৫৩৫ জন ও ২০১০ সালে ৬২ হাজার ৮২৬ জন শিক্ষার্থী। দেশে বর্তমানে ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি অনুমোদন রয়েছে। এর মধ্যে ৮০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here