১১ বছরেও শেষ হয়নি সিরিজ বোমা হামলার বিচার কাজ

0
5

ঢাকা (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ) : ভয়াবহ ১৭ আগস্ট, দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার ১১ বছর। ১১ বছর আগে ২০০৫ সালের এই দিনে দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা চালায় জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। সেই সময় একযোগে কেঁপে ওঠে সারা দেশ। সিরিজ বোমা হামলার ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ওই হামলার বিচারকাজ শেষ হয়নি। সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা ১৬১ মামলার মধ্যে ১০৩ মামলার রায় হয়েছে। এখনো বিচারাধীন রয়েছে আরো ৫৮ মামলা। জামিনে মুক্ত হয়ে অনেক আসামি ফের শুরু করেছে নিষিদ্ধ এই সংগঠনের পুনর্গঠনের কাজ, ছদ্মবেশে চালাচ্ছে দাওয়াতি কার্যক্রমও।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে মুন্সীগঞ্জ ছাড়া দেশের ৬৩ জেলার সাড়ে ৪শ’ স্থানে পাঁচ শতাধিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি। উগ্রপন্থী ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে যুদ্ধ ঘোষণা দিয়ে সে দিন আদালত, জেলা প্রশাসক কার্যালয়, সরকারি-আধাসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় একযোগে এই বোমা হামলা চালায় জেএমবি। এতে মারা যান দুইজন, আহত হন আরো দুই শতাধিক মানুষ। সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমেই তাদের জঙ্গি কার্যক্রমের প্রকাশ ঘটায় সংগঠনটি। এখানেই শেষ নয়- ১৭ আগস্টের পরও তারা বিভিন্ন স্থানে আত্মঘাতী হামলা চালায়। এসব হামলায় বিচারক, আইনজীবী, পুলিশ, সরকারি বেসরকারি কর্মকর্তাসহ আরো ৩৩ জন মারা যান। এরপরই তাদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযানে নামে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে মামলা দায়ের করা হয়েছে ১৬১টি। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৬৬০ জনকে। এর মধ্যে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে ৪৫৫ জন, জামিনে রয়েছে ৩৫ জন। বাকি ৫৩ জন এখনো পলাতক রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সিরিজ বোমা হামলার ১০৩ মামলার ঘোষিত রায়ে এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করা হয়েছে ২৬৪ জনকে এবং মামলা থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে ১২১ জনকে। মৃত্যুদণ্ড দেয়া ১৫ জনের রায়ের মধ্যে ৬ জনের রায় কার্যকর করা হয়েছে। এরা হলেন, ওই সময়ের শীর্ষ জঙ্গি নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই, খালেদ সাইফুলাহ, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল ও ইফতেখার হাসান আল মামুন।
ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা মামলায় ২০০৬ সালের ২১ মার্চ মামুন, সুলতান হোসেন খান, শায়খ আব্দুর রহমান, আব্দুল আউয়াল, আতাউর রহমান সানি, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাই, শাকিল আহমেদ মোল্লা ওমর (মৃত) ও মেহেদীসহ ৮জনকে আসামি করে চার্জশিট দাখিল করা হয়। ২০০৬ সালের ৩০ মে মামলার রায়ে শায়খ আব্দুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাই, আতাউর রহমান সানি, আব্দুল আউয়াল, মাসুম, খালিদ, সাইফুল্লাহসহ মোট সাতজনকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ রাতে এদের ৬ জনের মৃত্যুদ কার্যকর করা হয়। এ মামলার রায়ে মৃত্যুদ দেশপ্রাপ্ত অপর জঙ্গি আসাদুর রহমান আরিফ পলাতক রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সিরিজ বোমা হামলার সময় জঙ্গিরা একটি লিফলেট ছড়িয়ে জানায়, দেশে কর্মরত বিচারকদের প্রতি একটি বিশেষ বার্তা পাঠালাম। দ্রুত এ দেশে ইসলামী হুকুমত কায়েম করতে হবে। নতুবা কঠিন পথ বেছে নিতে বাধ্য হবে জেএমবি। ইসলামী হুকুমত কায়েমের বিষয়ে তাদের সঙ্গে দেশ-বিদেশের অনেক শক্তিশালী দেশ ও শীর্ষ রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করেছে। অতএব যারা বিচারক আছেন তারা তাগুতি আইন বাদ দিয়ে ইসলামী আইনে বিচার করবেন। নতুবা আরো ভয়াবহ বিপদ আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এ সর্তকবাণীর (সিরিজ বোমা হামলা) পর আমরা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করব। তারপর আবার হামলা শুরু হবে। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে সেই আত্বঘাতী হামলার পর সারা দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দেয়। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে মানুষ। একই সঙ্গে সারাদেশের ইসলামী চিন্তাবিদ এবং শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ বোমা হামলা করে মানুষ মেরে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের অপচেষ্টাকে ধিক্কার জানায়। বাংলাদেশ জঙ্গি কবলিত হয়ে পড়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক পরিমলে আলোচিত হয়। জঙ্গি গ্রেফতারে তৎপর হয়ে ওঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর থেকে ইতিহাসের পাতায় সে দিনটি একটি কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
সিরিজ বোমা হামলার সর্বশেষ রায় হয় ১৫ সালের ১০ আগস্ট। ২০০৫ সালে ১৭ই আগস্ট গাজীপুরের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনেসহ জয়দেবপুর থানাধীন নয়টি স্থানে সেদিন বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এ ঘটনায় দীর্ঘ ১০ বছর পর গত ১০ আগস্ট ঢাকার চার নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক আব্দুর রহমান সরদার, বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে আসামিদের ১০ বছর কারাদ প্রদান করেন। এ ছাড়াও অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় গ্রেফতার ২১ জনের মধ্যে ৪ জনকে খালাস দেন তিনি। বাকি ১৭ জনের প্রতেককে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদ পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো এক বছর কারাদ দেন। সিরিজ বোমা হামলার ৫ বছর পর ২০১০ সালে জেএমবির সব কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। কিন্তু নিষিদ্ধ এই জঙ্গি সংগঠনটি এখনো গোপনে ছদ্মনাম ব্যবহার করে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
সংশিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে নামে বেনামে প্রায় ৪০টি জঙ্গি সংগঠন রয়েছে। তবে অধিকাংশ সংগঠনই অকার্যকর। যারা কার্যকর তারাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাপের মধ্যে রয়েছে। রাজধানীর উত্তরা থেকে সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত আমিরসহ ৮ জনকে গ্রেফতার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেফতারকৃতরা দেশের ৬টি বিভাগে জেএমবিকে পুনর্গঠনের কাজ করছিল। কারাগারে থাকা জেএমবির ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা সাঈদুর রহমান ও শীর্ষ নেতা মুফতি জসিমউদ্দিনকে ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা ছিল। এমন তথ্য রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের পর পাওয়া গেছে বলে সংশিষ্ট সুত্রে জানা যায়।
১৫ সালেই সন্ত্রাস দমন আইনে আনসারুলাহ বাংলা টিমের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২০০৫ সালে ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা হামলার পর জেএমবি, হুজিসহ চারটি জঙ্গি সংগঠনকেও নিষিদ্ধ করে সরকার। একই অপরাধে ২০০৯ সালে নিষিদ্ধ হয় হিযবুত তাহরীর। গোয়েন্দা সুত্র জানায়, বাংলাদেশে জেএমবিসহ আনসারুলাহ বাংলা টিম, হরকাতুল জিহাদ (হুজি), হিযবুত তাহরীর, ইসলামিক স্টেটসের (আইএস) সদস্যরা একজোট হয়ে কাজ করছে।
পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা গোপন বৈঠকের মাধ্যমে নতুন দল গঠনের কাজ করছে। দেশে বড় ধরণের নাশকতা চালিয়ে আসামি ছিনতাইয়ের মতো পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। এনআইএ এর সঙ্গে জঙ্গি দমন ইস্যুতে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এনআইএ এর সঙ্গে র‌্যাব কাজ করছে। দুই দেশেরই লক্ষ্য জঙ্গি দমন করা।
র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, ২০০৬ সালের ২ মার্চ সিলেটের পূর্ব শাপলাবাগ এলাকার সূর্য দীঘল বাড়ি থেকে জেএমবির আমির শায়খ আব্দুর রহমানকে, ২০০৬ সালের ৬ মার্চ ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থানাধীন কেচুয়া বাজারের রামপুরা গ্রাম থেকে জেএমবির সেকেন্ড ইন কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইকে গ্রেফতার করা হয় ২০১০ সালের ২৫ মে এ রাজধানীর সবুজবাগ ও নারায়নগঞ্জ এলাকা থেকে জেএমবির পরবর্তী প্রধান মাওলানা সাইদুর রহমান, তার স্ত্রী নাইমা আকতার, সামরিক শাখার প্রধান আনোয়ার আলম শিবলু ও মজলিসে সুরা সদস্য সোহেল মাহফুজকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।
জঙ্গিদের ব্যাপারে র‌্যাবের ইন্টেলিজেন্স শাখার পরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানান, র‌্যাব এসব মামলার সরাসরি তদন্ত না করলেও আসামিদের গ্রেফতার করেছে। সিরিজ বোমা হামলার পর জেএমবির শীর্ষ নেতাদের আইনের আওতায় নিয়ে এসেছে র‌্যাব। র‌্যাব শুরু থেকেই জঙ্গি দমনে প্রতিনিয়ত কাজ করছে। পলাতক আসামিরা ভারতে গিয়ে নিরাপদে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু বর্ধমানে বোমা বিস্ফোরণের পর ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ তৎপর থাকায় জঙ্গিরা ভারতের অভ্যন্তরে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করতে পারছে না। আশা করছি দ্রুত তাদের গ্রেফতার করতে পারব। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সিরিজ বোমা হামলার সবগুলো মামলার তদন্ত শেষ করেছে পুলিশ। ওই মামলাগুলোর অধিকাংশ আসামিকেও পুলিশ গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি দেশের জঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে কর্মকর্তারা জানান, ২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত জঙ্গি দমনে ৬৩৮টি মামলায় ২ হাজার ৭৪৩ জন জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here