নারায়ণগঞ্জের ৭ খুন, হত্যাকান্ডের স্থানই চিহ্নিত করেননি তদন্ত কর্মকর্তা!

0
4

নারায়ণগঞ্জ (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ) : নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনাস্থলই চিহ্নিত করতে পারেননি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ মন্ডল। এতে আদালতে উপস্থিত আইনজীবীসহ সকলে হতবাক হয়ে পড়েন। হত্যাকা-ের স্থানই চিহ্নিত করতে না পারায় তদন্ত শেষে দাখিল করা চুড়ান্ত প্রতিবেদন নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। এ বিষয়ে আদালতে উপস্থিত অনেক আইনজীবী তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা পিও (ঘটনাস্থল) পরিদর্শন করেননি। অথবা তিনি নিজে এ মামলা তদন্ত করেননি। তাছাড়া মামলার যে খসড়া মানচিত্র অভিযোগপত্রের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে সেখানেও অনেক ত্রুটি রয়েছে। এ ঘটনায় সাত খুনে দাখিল করা চুড়ান্ত প্রতিবেদন নিয়ে বেশ সমালোচনার ঝড় বইছে। । মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ মন্ডল চার্জশীট দাখিলের সময় নারায়ণগঞ্জে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি ছিলেন। বর্তমানে তিনি জেলার বিশেষ শাখার পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত আছেন।
সুত্রমতে, গত বৃহস্পতিবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সাত খুনের মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে আসামীপক্ষের আইনজীবীদের জেরায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তার এ ভুল স্বীকার করেন। এতে মামলার তদন্তের অনেক ফাঁক ফোকর বেরিয়ে আসে।
মামলার প্রধান আসামী নূর হোসেনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খোকন সাহা তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জানতে চান-৭ জনকে অপহরণের পর কোন স্থানে হত্যা করা হয়েছে। সেই স্থানটি তদন্ত কর্মকর্তা চিহ্নিত করতে পেরেছেন কিনা? উত্তরে তদন্ত কর্মকর্তা না সূঁচক উত্তর দেন।
এরপর কাঁচপুর ল্যান্ডিং স্টেশনটি শীতলক্ষ্যা নদীর কোন তীরে অবস্থিত-এ প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, উত্তর দিকে। অথচ ল্যান্ডিং স্টেশনটি শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিত তীরে অবস্থিত। এ ল্যান্ডিং স্টেশন থেকেই ৭ জনের লাশ ট্রলারে তোলা হয়। পরে শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গা নদীর মোহনায় নিয়ে লাশ ফেলা হয়। আসামীপক্ষের আইনজীবীর গুরুত্বপূর্ণ ২টি প্রশ্নের উত্তর ভুল দেওয়ায় আদালতে উপস্থিত অনেক আইনজীবী তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা পিও ভিজিট করেননি। অথবা তিনি নিজে এ মামলা তদন্ত করেননি।
তাছাড়া মামলার যে খসড়া মানচিত্র অভিযোগপত্রের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে সেখানেও অনেক ত্রুটি আছে বলে আসামী পক্ষের আইনজীবীরা জেরার সময় তুলে ধরেন।
তারেক সাঈদের আইনজীবী তার জেরায় জানতে চান, তারেক সাঈদের ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে, র‌্যাব হেড কোয়াটারের মসিক সভায় এডিজি (অপারেশন) কর্নেল জিয়াউল আহসান নজরুলকে গ্রেফতার করতে তারেক সাঈদকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কর্নেল জিয়াকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। উত্তরে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি আমি পর্যালোচনা করিনি এবং র‌্যাব প্রধান কার্যালয়ের সভা সর্ম্পকে আমি অবগত ছিলাম না। ঘটনার আগে নূর হেসেন র‌্যাব কার্যালয়ে গিয়েছিল কিনা এমন প্রমাণ সংগ্রহের জন্য র‌্যাব-১১’র প্রধান কার্যালয়ের রেজিস্ট্রি খাতা সংগ্রহ করেছিলেন কিনা? উত্তরে তিনি বলেন, নূর হোসেন র‌্যাব অফিসে যায় নাই। যেসব র‌্যাব সদস্য এই মামলার সাক্ষী তাদের কেউ ১৬১ বা ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে বলেছে কিনা যে নূর হোসেন ঘটনার আগে র‌্যাব-১১’র সিও’র অফিসে গিয়েছিল। উত্তরে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন- না বলেন নাই।
মামলার অন্যতম আসামী লে. কমান্ডর (অব) মাসুদ রানার আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফরহাদ আব্বাস তার জেরায় বলেন, মাসুদ রানার নাম এফআইআর-এ ছিল না, তাকে কেউ সন্দেহও করেন নাই। উত্তরে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, হ্যাঁ। এফআইআর এ দন্ডবিধি ১২০ ধারা উল্লেখ ছিল না। উত্তরে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন-না। আইনজীবী বলেন, ঘটনার দিন ডিএডি আবদুস সালামের নেতৃত্বে যে ১২ জন র‌্যাব সদস্য রাস্তায় চেক পোস্ট বসিয়েছিল তাদের মধ্যে ৩ জনকে আপনি সাক্ষী করেছেন। বাকীদের করেননি। উত্তরে তদন্ত কর্মকর্তা হ্যাঁ সূচক উত্তর দেন। রানার আইনজীবী আরো বলেন, ঘটনার দিন ডিএডি আবদুস সালামের নেতৃত্বে যে ১২ জন রাস্তায় চেক পোস্ট বসিয়েছিল তারা র‌্যাবের চেইন অব কমান্ড মেনেই তা করেছিল? আপনি কি মনে করেন? উত্তরে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন-হ্যাঁ। র‌্যাবের ট্রলার যারা চালিয়েছিল তাদের আসামী না করে সাক্ষী করেছেন কেন? উত্তরে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন-তারা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন, তাই। ঘটনার দিন র‌্যাবের অনেক সদস্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ পালন করায় তা অপরাধ যোগ্য না হওয়ায় তাদের আসামী না করে সাক্ষী করেছেন-এমন প্রশ্নের উত্তরে তদন্ত কর্মকর্তা হ্যাঁ সূচক উত্তর দেন।
আসামী নুর হোসেনের পক্ষে অ্যাডভোকেট খোকন সাহা তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জানতে চান, নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি তার এজাহারে ০১-০১-২০১৪ ও ০২-০২-২০১৪ তারিখের দুটি ঘটনা উল্লেখ করেন, আপনি কী এই দুটি ঘটনার তদন্ত করেছেন? উত্তরে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন না। আইজীবীর প্রশ্ন- নিহত নজরুল ইসলামের শ্যালক আব্দুল্লাহ আল মামুন, খোকন ও রিয়াদকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন? তদন্ত কর্মকর্তার উত্তর না। প্রশ্ন-এজাহারের বর্ননা মতে একটি রাস্তার কাজ নিয়ে নুর হোসেন ও নজরুল ইসলামের মধ্যে বিরোধ হয়, ওই কাজের ঠিকাদার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ঠিকাদার তানজিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন? প্রশ্ন-৭জনকে অপহরন করতে কতটা সময় লেগেছিল? উত্তর জানা নেই। প্রশ্ন-৭জনকে কোথায় হত্যা করা হয়েছে ঘটনাস্থল চিহ্নিত করতে পেরেছেন? উত্তর না। প্রশ্ন-কাঁচপুর ল্যান্ডিং স্টেশন শীতলক্ষ্যা নদীর কোন পাড়ে অবস্থিত? উত্তর- নদীর উত্তর পাড়ে। প্রশ্ন-ওই স্টেশনের মানচিত্র অঙ্কন করেছেন? উত্তর- না। প্রশ্ন-ল্যান্ডিং স্টেশনে কতবার পরিদর্শন করেছেন? উত্তর- একাধিকবার। প্রশ্ন-ঘটনার সময় ল্যান্ডিং স্টেশনে ৩টি জেটি ছিল, দেখেছেন? উত্তর না। প্রশ্ন-পল্টুনে দুটি কেন্টিন আছে, দেখেছেন? উত্তর- না। প্রশ্ন- ২০১৩ ও ২০১৪ অর্থ বছরে ল্যান্ডিং স্টেশনের ইজারাদার কে ছিল? উত্তর- জানি না। প্রশ্ন-ল্যান্ডিং স্টেশনে রাতদিন লোড আন লোড হয়। উত্তর-জানা নেই। প্রশ্ন-ল্যান্ডিং স্টেশনের আশপাশের কাউকে মামলায় সাক্ষী করেছেন। উত্তর-না।
উল্লেখ্য, সেভেন মার্ডারের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাকে আসামীপক্ষের আইনজীবীদের জেরা অব্যাহত রয়েছে। বৃহস্পতিবার মামলার অন্যতম আসামী র‌্যাব-১১’র সাবেক অধিনায়ক তারেক সাঈদ মোহাম্মদের আইনজীবী তার জেরা সম্পন্ন করেন। এছাড়া আসামী লে. কমান্ডার (অব) মাসুদ রানা ও মামলার প্রধান আসামী নূর হোসেনের আইনজীবী জেরা করেন। তবে গতকাল নূর হোসেনের আইনজীবীর জেরা সম্পন্ন হয়নি। আগামী তারিখে নূর হোসেনের আইনজীবী আবারো তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করবেন। জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে তদন্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ মন্ডলকে জেরা করেন আসামী পক্ষের আইনজীবীরামামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য করা হয়েছে আগামী ৩ অক্টোবর। এ নিয়ে গত ৩ কর্মদিবসে তদন্ত কর্মকর্তাকে ৪ আসামীর পক্ষের আইনজীবীরা জেরা করলেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্ক রোড থেকে নাসিকের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ ৭ জন অপহৃত হয়। ৩দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দর উপজেলার শান্তিরচর এলাকা থেকে ৬ জনের এবং পরদিন ১ মে একই স্থান থেকে আরো একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মামুনুর রশীদ মন্ডল ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল নাসিকের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র‌্যাব-১১’র সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল (অব) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (অব) আরিফ হোসেন এবং লে. কমান্ডার (অব) মাসুদ রানাসহ ৩৫ জনকে আসামী করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মামলায় ১২৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১০৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। সর্বশেষ সাক্ষী হিসেবে তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য শেষে এখন জেরা চলছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here