আগামী নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে আ’ লীগ

0
4

ঢাকা (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ) : ২০১৯ সালের নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের ২০তম সম্মেলনকে ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির প্রথম ধাপ বলেই মনে করছেন রাজনীতিক ও বিশিষ্টজনেরা। তারা বলছেন, সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনসহ কাউন্সিলে দলীয় সভানেত্রীর বক্তব্য, দলের ঘোষণাপত্র, মানুষের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতিÑসবকিছুতেই আগামী নির্বাচনে দলের কৌশল ও অবস্থানের প্রতিফলন লক্ষ করা গেছে। ফলে আগামী নির্বাচন আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
গত শনি ও রোববারের কাউন্সিলে সভানেত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি দারিদ্র্যবিমোচন, ভিশন ২০৪১ ও নানা প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেছেন। মানুষের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, বৈষম্য দূর করা, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করার কথা উল্লেখ করেছেন। দলের ঘোষণাপত্রে আগামী দিনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। সেখানে উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে। কাউন্সিল সভার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। আওয়ামী লীগ ঘোষণা দিয়েছে, দল এখন আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। বার্তাটি বেশ পরিষ্কার। নির্বাচনকে সামনে রেখে শেখ হাসিনা ঘর গোছাচ্ছেন।
আগামী নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগকে তৈরি করাই নতুন কমিটির লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন দলটির নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিতে দলের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়-সংলগ্ন প্রিয়াংকা কমিউনিটি সেন্টারে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এ কথা বলেন সড়ক যোগযোগ ও সেতুমন্ত্রী। এ সময় দলের মধ্যে গুণগত পরিবর্তন আনার কথাও বলেন তিনি। তিনি বলেন, সবাইকে নিয়ে কাজ করবো এবং তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়াবো। দলের মধ্যে আরো শৃঙ্খলা নিয়ে আসার আশা ব্যক্ত করে সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমরা যদি নিজেদের মধ্যেই পরিবর্তন না আনতে পারি তাহলে কিভাবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের পরিবর্তন আনব। তার আশা, দেশের পরিবর্তন আনতে সব দলই তার সাহায্যে এগিয়ে আসবে।
দলের নতুন প্রেসিডিয়াম সদস্য ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এ দেশের ঐতিহ্যবাহী পার্টি। এ দলটি যে আরো শক্তিশালী হয়েছে এবং মান উন্নয়ন হয়েছে, এ সম্মেলনের মাধ্যমে তা আবারো প্রমাণিত হলো। এ দলই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই দলই এখন আগামী দিনের লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে এগিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত এ প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, কাউন্সিলে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের পাশাপাশি ঘোষণাপত্র পাস হয়েছে ও গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হয়েছে। আমি একজন সাধারণ কর্মী। আমার জন্য এটা (প্রেসিডিয়াম সদস্য) বিরাট প্রাপ্তি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার প্রতি আস্থা অর্জন করেন বলেই প্রেসিডিয়ামের সদস্য পদ দিয়েছে, এ জন্য তার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আমি চেষ্টা করব আমার উপরে সব দায়িত্ব পালন করার। তিনি বলেন, আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে ২০২১ সালের মধ্যে একটা লক্ষ্যে পৌঁছানো। এ লক্ষ্য (মধ্যম আয়ের দেশ) ইতোমধ্যে অনেকদূরই এগিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। যার জন্য আগামী নির্বাচন আওয়ামী লীগের শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়, ওই লক্ষ্য অর্জনের ধারাবাহিকতা রক্ষা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আশা করি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই লক্ষ্য অর্জনে আমরা সক্ষম হব।
আওয়ামী লীগের আরেকজন প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কেন্দ্রের সঙ্গে মাঠের নেতাদের যোগাযোগ কমে গেছে। বলা যায়, এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এমন কথা অনেক দিন ধরেই দলীয় সভানেত্রীর কাছে বলা হচ্ছে। সাধারণ সম্পাদকই মূলত এই সম্পর্ক দেখভাল করেন। এ কারণে হয়তো ওবায়দুল কাদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি কমবেশি সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। তারা বলেন, নির্বাচনের আরো দুই বছর বাকি আছে। এই সময়ের মধ্যে সব জেলা সফর, প্রার্থী মনোনয়নসহ নানা কাজ রয়ে গেছে। ওবায়দুল কাদেরকে এ কাজগুলোই করতে হবে। তা ছাড়া বিগত উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন পরিচালনায় কাদের প্রধান ছিলেন। এই নির্বাচনগুলোয় আওয়ামী লীগ ব্যাপকভাবে জয়লাভ করেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওয়ায়দুল কাদেরের সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হতে পারে। খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, নতুন সাধারণ সম্পাদকের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দলকে শক্তিশালী করে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করা। সাম্প্রদায়িক ও অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। আমার মনে হয় নতুন সাধারণ সম্পাদক এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম হবেন।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, সামনে নির্বাচন। আওয়ামী লীগ এখন নির্বাচনী মাঠের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। আগামী নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে দলকে সেভাবে প্রস্তুত করাই নতুন সাধারণ সম্পাদকসহ নতুন কমিটি নির্বাচন করা হয়েছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, নির্বাচিত কমিটি অনেক ভালো। আমি মনে করি আওয়ামী লীগ নির্বাচনমুখী দল। জাতীয় পার্টি ও আমরা আওয়ামী লীগ একসঙ্গে আছি। আগামী দিনেও এগিয়ে যাব।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষক রওনক জাহান মনে করেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো দলে প্রধান ব্যক্তির পরিবর্তন হবেÑএমনটা কেউ আশা করেন না। সাধারণত সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন হয়। আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে এবার সেটাই হয়েছে। স্বাধীনতার পরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদে একটানা দুই মেয়াদের বেশি কেউ থাকেননি। তাই সাধারণ সম্পাদক পদে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের জায়গায় এবার ওবায়দুল কাদের এসেছেন। তার মতে, বর্তমান কমিটি আগামী নির্বাচন পরিচালনা করবে। সে ক্ষেত্রে দল এমন একজনকে বেছে নিয়েছে, যার সাংগঠনিক দক্ষতা আছে। কর্মীদের পাশে থাকার মানসিকতা আছে। সেটা আগামী নির্বাচনের জন্য দলকে প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে খুবই জরুরি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম বলেন, মনে করা হচ্ছে, সাধারণ সম্পাদক পদে ওবায়দুল কাদের দলকে আরো গতিশীল করবেন, যেটি আগামী নির্বাচনের আগে খুবই জরুরি। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ‘ক্লিন ইমেজের’ মানুষ। ২০০৭ সাল থেকে দলের একটি খারাপ সময়ের মধ্যে দক্ষতার সঙ্গে নিজের কাজ করেছেন। যদিও তার সম্পর্কে এমন কথা প্রচলিত, তাকে সব সময় পাওয়া যায় না, দলের কাজে ততটা ‘অ্যাকটিভ’ নন। এই শিক্ষক বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি অংশ নেয়নি। আগামী নির্বাচনে সেটা না-ও হতে পারে। সবাই নির্বাচনে আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনে জয়ী হতে হলে আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এখন মাঠের নেতাদের সক্রিয় করা সবচেয়ে বেশি দরকার। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নতুন কমিটিকে অভিনন্দন জানাই। এই কমিটি আগামী দিনে দলের ভালো করবে বলেই তাদের নির্বাচন করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, এবারের কাউন্সিলে সবকিছুতেই আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতির ছোঁয়া ছিল। নেতৃত্ব নির্বাচনেও সে বিষয়ই সামনে এসেছে। তবে এরাই যদি ভোটের মাধ্যমে হতেন, তাহলে সেটা অপূর্ব ও অভিনব হতো। সরাসরি ভোট না হওয়া ছাড়া কাউন্সিলের সবকিছুই ভালো ছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here