এক নেতা এক পদ : বিএনপির জেলা কমিটি গঠনে প্রধান বাধা

0
3

ঢাকা (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ) : কেন্দ্রের সর্বশেষ চিঠির পর জেলা কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে এক নেতা এক পদ নীতির বাস্তবায়ন নিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় পড়েছেন বিএনপির তৃণমূলের নেতারা। এ ক্ষেত্রে অনেকেই এখন থেকে বিভিন্ন বিষয়ে কেন্দ্রের দ্বারস্থ হচ্ছেন। বিশেষ করে ‘এক নেতা এক পদ নীতি’ শিথীল করার সুযোগ আছে কিনা সে বিষয়ে জেলার নেতারা কেন্দ্রের আলাদা নির্দেশনা চান বলে জানা গেছে। গেল সপ্তাহে বিএনপির কেন্দ্র থেকে ৩০টি সাংগঠনিক জেলা ইউনিটকে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে কমিটি গঠনের ব্যাপারে গত দুই দিন বিভিন্ন জেলার নেতাদের সাথে কথা বললে তারা বিভিন্ন ‘প্রতিবন্ধকতার’ কথা তুলে ধরেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্তত ৭টি জেলার আহ্বায়করা জানান, কমিটি গঠনে এক নেতা এক পদ নীতি প্রধান ‘অন্তরায়’। বিষয়টি ব্যাখা করে তারা বলেন, ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি বিএনপির গঠনতন্ত্রে নতুন সংযোজন করায় তা কার্যকরে অনেক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। জেলা পর্যায়ের নেতাদের বেশির ভাগই এই নীতি মানতে অপারগ। আগে জেলার অনেক নেতাই দলের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য ছিলেন। এবার কাউন্সিলেও তাদের অনেকে কেন্দ্রীয় সদস্য হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। এক নেতা এক পদ নীতির কারণে তাদেরকে আর জেলা পর্যায়ে রাখা যায় না। আবার এই নেতাদের বাদ দিয়ে আনকোরা নেতাদের দায়িত্ব দিলেও উভয় সংকটে পড়তে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতারা জেলার দায়িত্ব ছাড়তে চান না। তাছাড়া আনকোরা নেতাদের দায়িত্ব দিলে তা সংগঠনের জন্যও ভালো হয় না। নেতারা জানান, গেল সপ্তাহের চিঠিতে কাউন্সিল করে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ‘এক নেতা এক পদ নীতি’র বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট বার্তা দেয়া হয়নি। তাই বিষয়টি জেলা পর্যায়ে কার্যকর হবে কিনা তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিএনপির একটি সাংগঠনিক জেলা ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত আহ্বায়ক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এক নেতা এক পদ নীতি কার্যকর করতে গিয়ে এবার কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে খোদ দলের চেয়ারপারসনই অনেক বেশি সময়ে নিয়েছেন। এখন জেলার কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও এই নীতি বাস্তবায়ন হলে আবারও নতুন নেতাদের খোঁজ-খবর নিতে হবে। এটা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ‘এক নেতা এক পদ’ নীতির ব্যাপারে কেন্দ্রের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে এবং তা সবাই মেনে নিলে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া অনেকটাই এগিয়ে যাবে। একই অঞ্চলের আরেক জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত আহ্বায়ক বলেন, আমার জেলায় সাবেক কমিটির বেশিরভাগ নেতা এবার কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। তারা আগেই কেন্দ্রীয় কমিটি এবং জেলা কমিটি উভয় জায়গায় ছিলেন। এখন নতুন নীতি বাস্তবায়ন করতে হলে তাদেরকে আর জেলা পর্যায়ে রাখার সুযোগ নেই। কিন্তু এই নেতারা ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি বাস্তবায়ন না করার জন্য সবচেয়ে বেশি তৎপর। তাদের এমন তৎপরতার কারণে কমিটি গঠনের কোনো কাজেই হাত দেয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি কেন্দ্রকে অবহিত করা হবে বলে তিনি জানান। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আরেকটি জেলার আহ্বায়ক জানান, আমার জেলার কয়েকজন সাবেক নেতা এখনই কমিটি গঠন না করতে পরোক্ষভাবে বিভিন্ন লবিং-তদবির করছেন। তারা আমাকে বলেছেন, এক নেতা এক পদ নীতি জেলা পর্যায়ে কার্যকর হবে না। এ ব্যাপারে নাকি শিগগির একটি নির্দেশনা দেয়া হবে। ওই নির্দেশনা দেয়ার পর কমিটি গঠন করতে তারা অনুরোধ করেছেন। ওই নেতা জানান, আমি এরই মধ্যে কেন্দ্রে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু নতুন নীতি বাস্তবায়ন না করার ব্যাপারে কারো কাছে কিছু শুনিনি। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতারা যদি নিজ জেলা কমিটি গঠনে সহযোগিতা না করেন তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কমিটি গঠন করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াবে।
বিএনপির দলীয়সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে কমিটি গঠনের ব্যাপারে দলের গঠনতন্ত্র পুরোপুরি অনুসরণ করা হবে কি না তা নিয়ে জেলার নেতাদের কেউ কেউ কেন্দ্রের কাছে যোগাযোগ শুরু করেছেন। বিশেষ করে বিএনপির তৃণমূলের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানের সাথে বিষয়টি নিয়ে অনেক নেতাই কথা বলা শুরু করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, গঠনতন্ত্র মেনেই জেলা কমিটি করার জন্য সংশ্লিষ্ট নেতাদের বলা হয়েছে। গঠনতন্ত্রের ব্যত্যয় হলে সেই কমিটি গ্রহণযোগ্য হবে না। ‘এক নেতা এক পদ’ নীতির বিষয়ে তিনি বলেন, দলের সর্বশেষ সম্মেলনে সারা দেশের কাউন্সিলরদের মতামত নিয়েই বিষয়টি গঠনতন্ত্রে সংযোজন করা হয়েছে। আর সম্মেলনে কাউন্সিলরদের মধ্যে জেলার নেতারাই সংখ্যায় ছিলেন বেশি। ফলে এই নীতি বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা চাই। আশা করি, সবাই বিষয়টি মেনে নিবেন।
জানা গেছে, গত ১৯ মার্চ বিএনপির সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি দলের গঠনতন্ত্রে সংযোজন করা হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে দলের ভেতরে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়। কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের আগে ও পরে অনেক নেতাই এই নীতির বিরোধিতা করেন। তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের পর ঢাকা জেলা এবং চট্টগ্রাম মহানগরীর কমিটি এই নীতির বাস্তবায়ন দেখা গেলেও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কমিটি ‘এক নেতা এক পদ’ নীতির যথাযথ বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। আফরোজা আব্বাস বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং একই সাথে মহিলা দলের সভাপতিও। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমদসহ আরো কয়েকজন নেত্রীর একাধিক পদ রয়েছে। জানা গেছে, এই বিষয়গুলো তুলে ধরেই বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি অংশ জেলা কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে নতুন নীতি শিথিল করার জন্য দলের হাইকমান্ডের কাছে লবিং করছেন। তবে এ ব্যাপারে এখনই হাইকমান্ড থেকে কোনো জবাব পাননি কেন্দ্রীয় নেতাদের ওই অংশ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, মহিলা দলসহ বিএনপির যে কোনো অঙ্গ সংগঠনের কমিটির দায়ভার স্বয়ং দলীয় প্রধানের। জেলা পর্যায়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা একটি কমিটি দেবে। সেটি চেয়ারপারসন অনুমোদন দেবেন। তখনই তিনিই সিদ্ধান্ত নেবেন এক নেতা এক পদ নীতি বাস্তবায়ন হবে কি না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here