ঝিমিয়ে পড়েছে বিএনপি’র সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড

0
5

ঢাকা (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ) : ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যখন ২০তম জাতীয় কাউন্সিল ঘিরে উজ্জীবিত, সে সময়ে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অনেকটাই কোণঠাসা। ঝিমিয়ে পড়েছে দলটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড। জাতীয় কাউন্সিলের সাত মাস পরেও সাংগঠনিকভাবে দলকে চাঙ্গা করে তোলার পরিকল্পনায় সফল হতে পারেনি বিএনপি। ‘এক নেতা এক পদ’ গৃহীত নীতিতেও তেমন সাড়া নেই।

ফলে দলটির কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যায়ে কর্মসূচি পালনে নেতাকর্মীদের মধ্যে গাছাড়া ভাব। শুধু তাই নয়, অঙ্গ-দলগুলোর অধিকাংশ মেয়াদোত্তীর্ণ। এদিকে খালেদা জিয়াও সক্রিয় কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামতে পারছেন না। তবে দলের নেতারা বলেছেন, জেলা কমিটি পুনর্গঠনের কাজ চলছে, নভেম্বরের মধ্যে এসব কমিটি গঠনের জন্য ডেটলাইন রয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৯ মার্চ দলের ষষ্ঠ কাউন্সিলে এক নেতার এক পদ নীতি গৃহীত হলেও এখন একাধিক পদ ধরে রেখেছেন প্রায় ৪৬ জন নেতা। তাতে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। তা ছাড়া জেলা কমিটিগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ। তৃণমূলকে সংগঠিত করতে না পারলে খালেদা জিয়া সক্রিয় কর্মসূচি দিতে পারছেন না।

এমন অবস্থায় ঘোষণা দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কমিটি পুনর্গঠন না করায় দলের কর্মীরা অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। এমন অবস্থায় দলের নেতাকর্মীরা প্রতিনিয়তই সাংগঠনিকভাবে ঐক্য হারাচ্ছেন। ভেঙে গেছে অঙ্গ-দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো। চলতি বছরের মধ্যে বিএনপিসহ অঙ্গ-দলগুলো পুনর্গঠনের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো হচ্ছে।

দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব মজিবুর রহমান সরোয়ার বলেন, ‘এখনো আমাদেরকে ওইভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। কাজটা শুরু হয়েছে। তবে একটু স্লো। কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে, আশা করছি খুব শিগগিরই কাজটা শুরু হবে।’

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘আমরা জেলা কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছি। ইতোমধ্যে মাদারীপুর, শেরপুরসহ কয়েকটি জেলার সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে।’

কবে নাগাদ বিএনপির পুনর্গঠনের কাজ শেষ হবে এমন প্রসঙ্গে তিনি বলেন,‘আগামী নভেম্বরের মধ্যে ৫০টি জেলা কমিটি করার পরিকল্পনা আছে। যদি পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে।’

দলের সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন বলেন, ‘মহাসচিব (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর) নভেম্বর মধ্যে টাইম-ফ্রেম বেঁধে দিয়েছেন। এর মধ্যে আমাদের জেলা কমিটিগুলো করতে হবে। তৃণমূলের জবাবদিহিতার মধ্যে আমাদের কাজগুলো করতে হচ্ছে। একটু সময় তো লাগবেই, নানা প্রতিবন্ধকতা আছে।’

একাধিক পদ ছাড়তে গড়িমসি

দলীয় নির্দেশনা উপক্ষো করে এখনো বিএনপির প্রায় ৪৬ নেতা একাধিক পদ ছাড়ছেন না। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত চিঠি পাঠানো হলে এর দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে একাধিক পদে রয়েছেন অন্তত ৬২ জন। এর মধ্যে ১৬ জন এক পদ রেখে অবশিষ্ট পদ ছেড়ে দিয়েছেন। বাকিরা এখনো গড়িমসি করছেন-বলে জানা গেছে।

জানা গেছে একাধিক পদ ছেড়েছেন-মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মো. শাহজাহান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, আহমেদ আজম খান, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, জয়নুল আবেদিন ফারুক, আমানউল্লাহ আমান, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মোজাহার আলী প্রধান, আশরাফ উদ্দিন নিজান, তৈমুর আলম খন্দকার, আফরোজা খান রিতা, ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, শিরিন সুলতানা, আসিফা আশরাফি পাপিয়া প্রমুখ। একাধিক পদে আছেন-এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, মিজানুর রহমান মিনু, অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার, খায়রুল কবির খোকন, ফজলুল হক মিলন, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, আসলাম চৌধুরী, হারুন অর রশীদ, মসিউর রহমান, আসাদুল হাবিব দুলু, অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, নজরুল ইসলাম মঞ্জু, মেহেদী আহমেদ রুমী, শাহজাদা মিয়া, ফরিদ উদ্দিন মানিক, আ ক ন কুদ্দুসুর রহমান, শরিফুল আলম, এ বি এম মোশাররফ হোসেন, ওয়ারেস আলী মামুন, মীর সরাফত আলী সপু, অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন, হাজী আমিনুল ইসলাম প্রমুখ।

ঢাকা মহানগর ও অঙ্গ-দলগুলোর সাংগঠনিক অবস্থা

দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেই ঢাকা মহানগর বিএনপিসহ অঙ্গ-দলগুলোর কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি করার ঘোষণা করা হবে এমন ঘোষণা খালেদা জিয়া নিজেই দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী মহিলা দল ছাড়া কোনো সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি যে কোনো সময় ঘোষণা হবে-এমন গুঞ্জনেই সীমাবদ্ধ।

ঢাকা মহানগর বিএনপি

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে আহ্বায়ক ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে সদস্য সচিব করে গত ১৮ জুলাই ২০১৪ সালে ঢাকা মহানগর বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। তাদের এক মাসের মধ্যে সব ওয়ার্ড ও থানা কমিটি এবং দুই মাসের মধ্যে মহানগর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট ওই সময়ের মধ্যে তারা নতুন কমিটি গঠনে ‘ব্যর্থ’ হন। এখনো মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি আলোর মুখ দেখেনি। পাশাপাশি আন্দোলনেও ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটি নগরীতে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।

যুবদল

সংগঠনটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পরপর কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটির গঠনের কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। ২০১০ সালের ১ মার্চ অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে সভাপতি ও সাইফুল আলম নীরবকে সাধারণ সম্পাদক করে পাঁচ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীকালে ২০১০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া ২০১ সদস্যবিশিষ্ট যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি অনুমোদন করেন।

স্বেচ্ছাসেবক দল

২০১০ সালে ২৩ আগস্ট স্বেচ্ছাসেবক দলের ৩৩৩ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন এ কমিটি অনুমোদন করেন। এর আগে ২০০৯ সালের ১১ অক্টোবর হাবিব-উন-নবী সোহেলকে সভাপতি ও মীর সরাফত আলী সপুকে সাধারণ সম্পাদক করে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। কয়েক মাস পর সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে শফিউল বারী বাবুকে মনোনীত করা হয়। স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতিকে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব করা হয়েছে। এছাড়া তিনি ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। সংগঠনের সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপুকে বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক-বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটি পুনর্গঠনের গুঞ্জন থাকলেও নতুন কমিটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

কৃষক দল

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপি মহাসচিব হওয়ার পর কৃষক দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান দুদুকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়েছে। তবে তিনি এখন কৃষক দলের সঙ্গে আছেন। ১৯৯৮ সালের ১৬ মে সম্মেলনের মাধ্যমে মাহবুবুল আলম তারাকে সভাপতি ও শামসুজ্জামান দুদুকে সাধারণ সম্পাদক করে কৃষক দলের কমিটি গঠন করা হয়। ২০০১ সালে তারা বহিষ্কৃত হলে সিনিয়র সহসভাপতি মজিবুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। ২০০৮ সালে তিনি মারা যাওয়ার পরে আরেক সহসভাপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়েছিল।

শ্রমিক দলে বিদ্রোহী কমিটি

মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রায় দুই বছর পর বিএনপির অন্যতম সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সপ্তম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ১৯ এপ্রিল। এ কাউন্সিলে আনোয়ার হোসেনকে সভাপতি ও নূরুল ইসলাম নাসিমকে সাধারণ সম্পাদক করে শ্রমিক দলের ৩৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। ২০১৪ সালে ২৪ সেপ্টেম্বর গত কমিটিকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ২০১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করে বিদ্রোহীরা। কমিটিতে নাজিম উদ্দিনকে সভাপতি ও আব্দুল খায়ের খাজাকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। সংগঠনটির কর্মী-সমর্থকরা নতুন কমিটি গঠনের দাবি তুলেছেন।

ছাত্রদল

দুই বছর মেয়াদি ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ১৪ অক্টোবর। ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর রাজীব আহসানকে সভাপতি ও মো. আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৫৩ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি ৭৩৪ জন সদস্যকে নিয়ে ওই কমিটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। বর্তমানে কত সদস্য সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় আছেন তা কেউ জানাতে পারেননি।

ওলামা দল

২০০৫ সালের প্রথম দিকে আব্দুল মালেককে সভাপতি ও শাহ নেছারুলকে সাধারণ সম্পাদক করে ওলামা দলের কমিটি করা হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির নেতারা দলীয় মিলাদ ও দোয়া মোনাজাতের মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছেন এমন আলোচনা আছে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেই।

তাঁতী দল

২০০৮ সালের ২২ মে হুমায়ুন ইসলাম খানকে সভাপতি ও আবুল কালাম আজাদকে সাধারণ সম্পাদক করে তাঁতী দলের কমিটি গঠন করা হয়। তাঁতশিল্পের মতোই এ সংগঠনটি বিলুপ্তির পথে।

মৎস্যজীবী দল

২০১১ সালে ১৭ ডিসেম্বর সভাপতি রফিকুল ইসলাম মাহতাব ও সাধারণ সম্পাদক মো. নূরুল হক মোল্লার দ্বন্দ্বের কারণে পাঁচ বছরেও মৎস্যজীবী দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়নি।

জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)

জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে অনেক আগে। ২০১০ সালে এমএ মালেককে সভাপতি ও কণ্ঠশিল্পী মনির খানকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩৪৫ সদস্যবিশিষ্ট জাসাসের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল।

মহিলা দল

প্রায় ১৫ বছর পর সম্প্রতি মহিলা দলের কমিটি ঘোষণা করা হয়। তা-ও আবার দলের এক আস্থাভাজন নেতা (আ স ম হান্নান শাহ) মৃত্যুর দিনে। এই অনেক সমালোচনা শুনতে হয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের। নতুন কমিটিতে সভাপতি পদে আফরোজা আব্বাস ও সাধারণ সসম্পাদক পথে সুলতানা আহম্মেদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here