নাসিক নির্বাচনে আউট ১৪ কাউন্সিলর

0
4

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ): শেষ বলে একটা কথা আছে। তার প্রমান দিয়েছেন নগরবাসী। গোপন বুথে জনতা রায় দিয়েছে ব্যালটের মাধ্যে। বাদ পড়েছেন বতর্মান ১৪ কাউন্সলর। তাদের বিরুদ্ধে অহঙ্কার, দাম্ভিকতা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, বিতর্কিত কর্মকান্ড, সন্ত্রাস ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ ছিল। তাই সাধারণ ভোটাররা তাদের প্রত্যাখান করেছে। আর বিজয়ের হাসি হাসছেন নতুন ১৮ মুখ। এছাড়া একাধিক চেক জালিয়াতি ও অপহরন মামলার আসামী এবং বিতকির্ত কর্মকান্ডের কারণে পরাজয় জেনে প্রার্থী হননি ১৭নং ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর আলমগীর হোসেন। এবং কেলেঙ্ককারীর কারণে প্রার্থী হননি সংরক্ষিত ২নং ওয়ার্ডের বর্তমান (৪,৫,৬) নারী কাউন্সিলর আলোচিত নুর হোসেনে গালফেন্ড হিসেবে পরিচিত জান্নাতুল ফেরদৌস নীলা। অপরদিকে ২৬নং ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন আনু নির্বাচন করেননি। কারণ পারিবারিক সিদ্ধান্তে তার ভাই মোজাম্মেল হককে প্রার্থী করা হয়। তাদের আত্মবিশ্বাস ছিল বন্দরে তারা একটি রাজনৈতিক পরিবার। তাদের একটা শক্ত অবস্থান রয়েছে। তাই পরিবার থেকে যে দাড়াবে সেই বিজয়ী হবে। কিন্তু ফলাফল হয়েছে উল্টো। বিএনপি সমর্থিত সামসুজ্জোহার কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হন মোজাম্মেল হক। ফলে নাসিকের বর্তমান পরিষদ থেকে ১৮ জন ছিটকে পড়েছে। এরমধ্যে কাউন্সিলর (সাধারণ) ওয়ার্ডে ১২ জন ও সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডে ৬জন। অন্যদিকে নতুন মুখ এসেছে ১৮জন। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে ১৪ প্রার্থীর পরাজয়ের নানা কারণ চিহ্নিত করা গেছে।
১নাম্বার ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর আব্দুর রহিম। কিন্তু পরিবারের পক্ষ চাপ ছিল তিনি যেন এবার নির্বাচন না করেন। নাছোড় বান্দা আব্দুর রহিমের আত্মবিশ্বাস ছিল তিনি বিজয়ী হবেন। তার বংশ থেকে ৫জন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এরমধ্যে আব্দুর রহিম ও তার বড় ভাই সিরাজুল ইসলামও ছিল। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা আব্দুর রহিমকে প্রত্যাখান করে। বড় বাইয়ের চেয়েও কম ভোট পান তিনি। বিজয়ী হয় তার ভাতিজা ওমর ফারুক।
২নাম্বার ওয়ার্ডে বতর্মান কাউন্সিলর সেলিনা ইসলাম বিউটী। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় নাসিকের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম নিহত হওয়ায় উপ-নির্বাচনে স্বামীর ২নং ওয়ার্ডে বিউটি কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। কিন্তু তার দায়ের করা মামলার আসামী ইকবাল হোসেনের কাছে তিনি পরাজিত হন। কারণ বিউটির বাবা শহীদ চেয়ারম্যান জামাতা নজরুল ইসলাম নিহত হওয়ার পর সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন সেক্টরে দখল দারিত্ব ও লুটপাট শুরু করে। চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে। হয়রানী শিকার হয় এলাকার নিরীহ অনেক মানুষ। ফলে দিন দিন ক্ষোভ দানা বাধে। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস করেনি। কারণ কেউ কোন প্রতিবাদ করতে চাইলে শহীদ চেয়ারম্যান তাকে সাতখুনের মামলায় জড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিতো। এসব কারণে বিউটির ইমেজ খারাপ হতে থাকে। পার পরিনতি ঘটে বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠিত নির্বাচনে। গত ৫ বছরে ২৯ কোটি ৩ লাখ, ৪৯ হাজার ৩৯৩ টাকার উন্নয়ন কাজ করার পর তিনি পরাজিত হন শুধু মাত্র পিতার অপকর্মের কারণে। এলাকাবাসী বলছেন, বিউটির বিরুদ্ধে তেমন অভিযোগ না থাকলেও বাপের (শহীদুল ইসলাম) পাপের খেসারত দিয়েছে সে।
৫নাম্বার ওয়ার্ডে বতর্মান কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম হেরেছেন শুধুমাত্র এলাকাবাসীর সঙ্গে সমন্বয়হীনতার কারণে। এছাড়া গত ৫ বছর মাদক নির্মূলে বা প্রতিরোধে কোন ভুমিকা রাখেননি তিনি। এলাকার রাস্তা-ঘাট নির্মানের সময় তার কার্যকরী প্রদক্ষেপ না থাকায় রাস্তা প্রশস্থ করা যায়নি। সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছেন নিজস্ব কিছু লোকদের নিয়ে। ফলে গোপন ব্যালটে জবাব দিয়েছে ওয়ার্ডবাসী।
৬নাম্বার ওয়ার্ডে গত ৫ বছর মাদকের ভয়াবহতা ছিল চোখে পড়ার মত। অলিগলিতে মাদক ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ে। এই মাদক ব্যবসা বন্ধে কোন প্রকার ভুমিকা পালন করেননি বর্তমান কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম মন্ডল। অভিযোগ আছে গতবার চোরাই তেল ব্যবসার বিপুল পরিমান টাকা খরচ করে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয় সে। চোরাই তেলের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে পুলিশ কনস্টবল মফিজ অপহরন ও হত্যাকান্ডের শিকার। পরবর্তীতে পুলিশ কনস্টবল মফিজ হত্যা মামলায় সিরাজ মন্ডলকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। এলাকাবার বিচার শালিসেও সিরাজ মন্ডলের ভুমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তাছাড়া উপরে আওয়ামীলীগ ভেতরে বিএনপির সঙ্গে আতাত থাকায় বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি সাধারণ ভোটাররা। যার কারণে এবার পরাজিত হয়েছেন ৯৫২ ভোটের ব্যবধানে।
১০ নাম্বার ওয়ার্ডের বতর্মান কাউন্সিলর হাবি তৌহিদ মোহাম্মদ গত তিন বছর ধরেই অসুস্থ ছিলেন। ফলে এলাকার উন্নয়নে কার্যকরী ভুমিকা রাখতে পারেননি। তারপরও তার আত্মবিশ্বাস ছিল গতবারের মতো এবার ভোটাররা তাকে মুল্যায়িত করবে। কিন্তু ঘটেছে উল্টোটা।
১৪ নাম্বার ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান মনির মহানগর আওয়ামীলীগের সদস্য। ক্ষমতাসীন দলের লোক হওয়ার পরও জাপা সমর্থিত প্রার্থীর কাছে তিনি হেরে গেছেন। তার পরাজয়ের পেছনে নিজের অতিরিক্ত আত্মবিশ^াস কাল হয়ে দাড়িয়েছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
১৬ নাম্বার ওয়ার্ডে হাজী ওবায়দুল্লাহ ২০০৩ সালে পৌরসভার কমিশনার ও ২০১১ সালে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচত হন। পরে কাউন্সিলরদের ভোটে প্যানেল মেয়র-১ নির্বাচিত হওয়ার পর তার দম্ভুক্তি বাড়তে থাকে। ডা. সেলিনা হায়াত আইভীর অত্যন্ত আস্তাভাজন হওয়ার পর তিনি এলাকার অনেককেই তেমন একটা পরোয়া করতেন না। এলাকার সাধারণ মানুষও নিজেদের মতো করে তাকে কাছে পায়নি। জননিবন্ধন ফরমে সাক্ষর আনতে গিয়ে নানা হয়রানীর শিকার হয়েছেন। ফলে তারা ক্ষোভের বহি:প্রকাশ ঘটায় বৃহস্পতিবার ব্যালটের মাধ্যমে।
১৭ নাম্বার ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর শুরু গতবার বিজয়ী হওয়ার কিছুদিন পর থেকেই এলাকায় নানা বিতর্কের জন্ম দেয়। জমদিখলসহ বিভিন্ন অপকর্মের কারণে এলাকাবাসী তার বিরুদ্ধে মিছিল করেছিল। এছাড়া বেশ কয়েক চেক জালিয়াতি মামলা কারাভোগ এবং অপহরন মামলার আসামী হওয়ায় নিশ্চিত পরাজয় আঁচ করতে পেরে নির্বাচনে সে প্রার্থী হয়নি বলে জানিয়েছেন ওই ওয়ার্ডের অনেক বাসিন্দা।
২০১১ সালে কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার আগে এবং পরে সেলিনা হায়াত আইভীর সঙ্গে থাকলেও মাঝপথে এসে ভোল পাল্টে ওসমান পরিবারের ঘনিষ্টজন বনে যান কামরুল হাসান মুন্না। ১৮নং ওয়ার্ডবাসী বিষয়টিকে ভালো চোখে নেয়নি। মুন্নার মধ্যে অহংকার আর দাম্ভিকতাও লক্ষ্য করে এলাকাবাসী। এছাড়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনে মাদক ব্যবসায়ীর তালিকায় তার নাম উঠে আসে। সাধারন জনগণ কেউ সেবা পেতে গেলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতেন মুন্না। এমন অভিযোগ ছিল এলাকাবাসীর। চরম আত্ম বিশ্বাস ও মুন্নার অহংকারের পতন ঘটিয়েছেন এলাকাবাসী গোপন ব্যালটে।
২৭ নাম্বার ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম গতবার নির্বাচিত হওয়ার পর মদনপুরে অটোস্ট্যান্ড দখল, ছেলের বেপরোয়া কর্মকান্ড তাকে বিতর্কিত করে তোলে। এলাকার বিচার শালিসে তার ভুমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। তার ছেলে এক সিএনজি চালকে ধরে বাড়িতে নিয়ে মারধর করায় ও সিএনজি ভাংচুর করার ঘটনাটি এলাকায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। যার খেসারত তাকে দিতে হয়েছে এবারের নির্বাচনে।
অন্যদিকে অতিরিক্স আত্মবিশ^াস, অহংকার ও বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারণে বন্দর এলাকায় সংরক্ষিত তিনজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের তিনজনই পরাজিত হয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছে শহর ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় ২টি ওয়ার্ডে। পরাজিত ওই নারী কাউন্সিলররা হলেন, ৩নং ওয়ার্ডে (৭,৮,৯) রেহানা পারভীন, ৬নং ওয়ার্ডে (১৬, ১৭, ১৮) খোদেজা খানম নাসরিন, ৭নং ওয়ার্ডে (১৯, ২০, ২১) রেজওয়ানা হক, ৮নং ওয়ার্ডে (২২,২৩,২৪) ইসরাত জাহান খান স্মৃতি, ৯নং ওয়ার্ডে (২৫,২৬,২৭) কাজী ইফ্ফাত জাহান। এছাড়া ২নং ওয়ার্ডের (৪,৫,৬) বর্তমান কাউন্সিলর জান্নাতুল ফেরদৌস নীলা নির্বাচিত হওয়ার কয়েকদিনের মাথায় আলোচিত সেভেন মার্ডারের মামলার আসাম নুর হোসেনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। একসময় নুর হোসেনে গাল ফেন্ড হিসেবে পরিচিত পান। দেশ ও দেশের বাইরে নুর হোসেনের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে নানা মুখরোচক গল্পের জন্ম দিয়েছেন। মাদক ব্যবসার অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে। এক পর্যায়ে সাতখুনের ঘটনার পর একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন তিনি। পরে জামিয়ে মুক্তি পান। এসব কারণে পরাজয় আঁচ করতে পেরে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেননি তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here