আজ: বুধবার, ২২শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং, ৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল, ৫ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী, দুপুর ১:৩৬

অধ্যাপিকা নাজমা রহমানের মৃত্যুর প্রথম বছর ও আওয়ামী লীগ

দাউদ হায়দার (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ:) পরিকল্পনা ছিল আত্মজীবনী লেখার, প্রস্তুতি প্রায়-সম্পন্ন, কোন বিষয় মূখ্য, বলছিলেন একবার, বার্লিনে, সাক্ষাৎকারে। মামুলি-কথার চরিত্রকাহিনি নয়, কিংবা ‘যা দেখেছি, যা শুনেছি, যা পেয়েছি’, এসব আয়োজনও নয়। অভিজ্ঞতার দোলাচলে যে বিক্ষোভ ও উৎক্ষেপণের সংঘর্ষ, সংকট মুহূর্তের বিশ্বাস এবং বিচার, সময় কিভাবে বিভাজিত, কোন শক্তির মূলে অভিযাত্রা মননজাত হয়, কেন এর পূরবী ওর বিভাসকে মিলিয়ে দেখার প্রয়াস, এই ছিল তার আন্তরিক ভাষ্য।
–  লেখা হয়নি কিছুই, অকালে বিপর্যয়।
–  নাজমা রহমানের কথা বলছি।
কেন বিপর্যয়? পরে আসছি ঘটনায়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ মার্চ (১৯৭১) স্বর্ণাক্ষরে লেখা। নাজমা রহমানের জন্ম ৭ মার্চে, তবে কুড়ি বছর আগে, ১৯৫১ সনে, পাবনার বনোয়ারি নগর গ্রামে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, ওই কুড়ি বছর আগে রাজনীতির হাওয়া উত্তাল, শুরু হয়ে গিয়েছে ভাষা আন্দোলন, মূলে স্বাধীকারের প্রশ্ন।
পাঁচ বছর বয়সে নাজমা রহমান ভিটেমাটি ছাড়া, পিতার চাকরিসূত্রে, ঠাঁই নারায়ণগঞ্জে। উদ্বাস্তু নন ঠিকই, কিন্তু স্বভূমি ত্যাগ পরবাসের নামান্তর। আর পাঁচজন পরবাসী যা করেন শিরিনও (নাজমা রহমানের ডাকনাম) ব্যতিক্রম নন। পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, পারিপার্শ্বিক জল হাওয়ায়, আঞ্চলিক-সাংস্কৃতিবোধে উদ্দীপ্ত হওয়া, গড়ে তোলা।

স্কুলের চৌকাঠ পেরোনোর আগেই শিল্পসংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত, আবৃত্তি সংসদ, নাট্যচক্রে। বাচিকশিল্পী, নাট্যশিল্পীও। পরে তারই পরিচালনায় ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ নাটক মঞ্চস্থ (১৯৮০) নারায়ণগঞ্জে।

‘শিরিন’ নামের মধ্যেই শৈল্পিকসত্তা ও রোমান্টিকতার ঝলক আছে (যেমন, শিরি [শিরিন]- ফরহাদের বিখ্যাত প্রণয়কাহিনি)। ‘শিরিন’ ফারসি নাম। একটি বিশেষ গোলাপেরও নাম। স্নিগ্ধতার প্রতীক। মায়াময়। সৌন্দর্যেরও প্রতীক। পারস্যকূলের অনেকেরই বিশ্বাস, ‘শিরিন’ কেবল রোমান্টিকই নয়, বিপ্লবী। খাঁটি রোমান্টিকই মূলত বিপ্লবী। নাজমা রহমান (শিরিন) সব প্রতীকেই একক।

ম্যাট্রিক পরীক্ষা চলাকালীন মুজিবুর রহমান (বাদল)- এর সঙ্গে পরিচয়। পরে পরিণয়। বাদলের রসিকতা, ‘নকল সাপ্লাই করেছিলাম’। মুজিবুর রহমান খ্যাতনামা সাংবাদিক। বাদল নামে অধিক পরিচিত। দৈনিক সংবাদ-এর চিফ রিপোর্টারও ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে দীপ্ত। নাজমা রহমানও সাংবাদিকতা করেছেন, লেখালেখিও। নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠায় অগ্রনী। বিয়ের পরে লেখাপড়ায় খামতি নেই, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েছেন, তিন কন্যার জননীও হয়েছেন।

পড়াকালীনই প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতি, ছাত্র ইউনিয়নে সামিল। অক্লান্ত কর্মী। নাজমা রহমানকে প্রথম দেখি (১৯৭০) নারায়ণগঞ্জে, তুলারাম কলেজে, ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী সম্মেলনে। ঝকঝকে, মার্জিত, সুন্দরী, সপ্রতিভ চেহারা। নাম শুনলাম, শিরিন। নানাগুনে গুনবতী। বাচিকাশিল্পী। নাট্যশিল্পী। লেখিকা। বিপ্লবী। সামাজিক। মানবকর্মী। ধীরোদাত্তী।

মুজিবুর রহমান (বাদল) সাংবাদিক, কমিউনিস্ট, রাজনীতিকও। স্বামীর প্রভাব আছে হয়তো, কতটা, বলতে অপারগ। এই নিয়ে নাজমা রহমানকে (ডাকতুম ‘শিরিন আপা’) জিজ্ঞেস করিনি কখনও।

জানা আছে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা চুপ, আত্মগোপনে, টু শব্দ নেই, নাজমা রহমান সগর্বে প্রকাশ্যে জানান তিনি আওয়ামী লীগ। যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগে। ভয়ডর নেই। সাহসিনী বটে। আওয়ামী মহিলা লীগের হাল ধরেন। আলি আহম্মদ চুনকার মৃত্যুর পরে আওয়ামী লীগের পূর্ণ-দল গঠনে সক্রিয়, সর্বেসর্বা। আওয়ামী লীগের সম্পাদক এবং পরে সভাপতি নির্বাচিত। ১৯৭৯ সনে নারায়ণগঞ্জে পৌরসভার কমিশনারের দায়িত্ব নিয়ে শহরে যত উন্নতি, কল্যাণমূলক কাজ করেছেন নিন্দুক, বিরুদ্ধবাদী, বিরোধী দলীয়রাও স্বীকার করেন উচ্চকণ্ঠে।

মনে পড়ছে, নাজমা রহমানই প্রথম, সরকারি-বেসরকারি চাকরিক্ষেত্রে, পাসপোর্টে, বায়োডাটায় বাবার নামের সঙ্গে মায়ের নামও উল্লেখ প্রস্তাব করেন। শেখ হাসিনার রাষ্ট্র ক্ষমতাকালে গৃহীত।

শিরিনের রাজনীতি-কথকতা বিস্তারিত করার আগে ওর সংস্কৃতিপ্রেম নিয়ে আরও-একটু বয়ান। এখানে রাজনীতিক নাজমা রহমান নন, এখানে সাংস্কৃতিক শিরিন। ঢাকার তুলনায় নারায়ণগঞ্জ মফস্বল। এই মফস্বলে ‘ললনাচক্র’ নামে একটি ফ্যাশনচক্রের মূলে, বাটিকের পোশাক তৈরি করে ১৯৭৯ সনে ফ্যাশন শো, ললনাচক্রের উদ্যোগে জাতীয় ‘আলু প্রদর্শনী’, প্রথম পুরস্কারও প্রপাক। শুনেছিলাম, এরশাদের এক মন্ত্রী নাকি, ললনাচক্রের আলু প্রদর্শনী থেকে দুই কিলো আলু কিনে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘প্রদর্শনীর আয়োজক কে?’ নাজমা রহমানের নাম শুনে সটকে পড়েন। পড়বেনই। স্বৈরশাসকের আমলেই নাজমা রহমানের মহৎকীর্তি, বোরখা পড়ে এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামিল, আন্দোলন পরিচালনা। নেত্রী। স্বৈরশাসকের বরদাস্ত হয় না। কারাবন্দি নাজমা (১৯৮৭ সনে), একমাস পাঁচদিন। এরশাদ তাকে কাবু করতে পারেনি। তিনি রক্তমাংশে বিপ্লবী। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত। আওয়ামী লীগের চেতনায় উজ্জীবন। আওয়ামী লীগের প্রথম মহিলা সভাপতি (নারায়ণগঞ্জ)। আওয়ামী লীগ থেকেই নারায়ণগঞ্জে ৪ আসনে সাংসদপদে প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৮৬), কিন্তু স্বৈরাচারী এরশাদ বলে কথা, নাজমা রহমান বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও মিডিয়া ক্যু, পরাজিত ঘোষণা।

বেগম জিয়া ক্ষমতাসীন হয়ে জাতিসংঘে নিজের ফিরিস্তি গাইতে গিয়েছেন, নাজমা রহমান তখন আমেরিকার আরিজোনায়, বড়ো কন্যা তানিয়া রহমান (লুনা)-এর আস্তানায়। ছুটে যান নিউ ইয়র্কে, জাতিসংঘের সদরদফতরের সামনে কালো পতাকা নিয়ে সরব প্রতিবাদ। সঙ্গে নিউ ইয়র্কে আওয়ামী লীগের শত-শত কর্মী। নেতৃত্বে নাজমা রহমান।

১৯৯৬ সনে শেখ হাসিনা বিজয়ী, রাষ্ট্র পরিচালনায়। নাজমা রহমান আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক, রূপালি ব্যাঙ্কের আর্থিক উন্নতি।

স্বামী মুজিবুর রহমান বাদলের আকস্মাৎ মৃত্যুর পরে ভেঙে পড়েননি নাজমা, বরং রাজনীতিতে আরও বেশি সক্রিয়, সার্বক্ষণিক কর্মী।

তদারকি সরকারের আমলে, ২০০৭ সনে, বিক্ষোভ-আন্দোলনে ছিলেন প্রথম কাতারে, অতঃপর পুলিশি হামলা। মাথায় গুরুতর আঘাত, জখম। অবস্থা সংকটাপন্ন। চিকিৎসায় আরোগ্য নন, দ্বিতীয় জয়িতা রহমান (সোমা), জামাতা মোহাম্মদ হোসেন মন্টুর কাছে, জার্মানি, ফ্রাঙ্কফুর্টে আসেন। চিকিৎসায় ধরা পড়ে ডিসেনশিয়ায় আক্রান্ত। পরে আলসহাইমারায় বড়ো কন্যা লুনার কাছে আবার, চার বছর চিকিৎসাতেও উন্নতি নেই। আরিজোনায় ১৬ আগস্ট মধ্যরাতে সিভিয়ার কার্ডিয়াক অ্যাটাক। আরিজোনার বিখ্যাত হাসপাতাল বেরলার্ডে ভর্তি, ৩ দিন লাইফ সাপোর্ট, গাঁও-ঘর-দেশ-ভিটেমাটি ছেড়ে, দূর পরবাসে মৃত্যুর কী যন্ত্রণা, মৃতই জানেন কেবল।

১৯ আগস্ট ছিল নাজমা রহমানের প্রথম মৃত্যুর বছর। আওয়ামী লীগ কি এই নিবেদিত কর্মীকে মনে রেখেছে? স্মরণ করেছে?

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

Share

Author: 24bdnews

4776 stories / Browse all stories

Related Stories »

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুকে আমরা »

ছবি সংবাদ »

নিউজ আর্কাইভ »

MonTueWedThuFriSatSun
  12345
20212223242526
27282930   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
    123
11121314151617
252627282930 
       
 123456
28293031   
       
     12
3456789
10111213141516
24252627282930
31      
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031    
       
     12
17181920212223
24252627282930
       
  12345
2728     
       
      1
23242526272829
3031     
   1234
262728293031 
       
   1234
12131415161718
       
      1
3031     
29      
       
      1
16171819202122
30      
   1234
12131415161718
19202122232425
262728293031 
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930    
       
     12
17181920212223
24252627282930
31      
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
       

সবশেষ সংবাদ »

সারাদেশ »