• রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৫:৫২ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

সিদ্ধিরগঞ্জে টাইগার ফারুকের মাদকের আস্তানায় পুলিশের তালা

বাংলা ২৪ বিডি নিউজ:
আপডেট : শুক্রবার, ২৯ জুলাই, ২০২২

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি টিসি রোড এলাকায় মাদক ব্যবসা ও মাদক সেবনের নিরাপদ স্থান হিসেবে পরিচিত কথিত যুবলীগের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে পুলিশ। এসময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মাদক সম্রাট টাইগার ফারুক, পরিবহন চাঁদাবাজ লেতুর সামাদগংরা পালিয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে টাইগার ফারুক বাহিনী এই কার্যালয়ের ভেতর মাদক সেবন ও মাদক বিক্রিসহ নানা অপরাধ কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছিল। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে তারা কার্যালয়ের ভেতর সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ আওয়ামীলীগ নেতাদের ছবি ঝুলিয়ে রাখে। সবশেষ কার্যালয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সদস্য সদস্য শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমানের ছবি ঝুলায় এবং সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল দুই নাম্বারের ছাত্রলীগ নেতা বাপ্পী ও মজিদের মাধ্যমে অয়ন ওসমানের সাথে দেখা করে ছবি তোলে অয়ন ওসমানের সাথে টাইগার ফারুক। এক পর্যায়ে বুধবার সেই ছবি ফেসবুকে পোস্ট দেয় টাইগার ফারুক। বিষয়টি পরে জানতে পেরে ফেসবুকে নিজের আইডি থেকে বুধবার (২৭ জুলাই) সন্ধ্যার পর অয়ন ওসমান একটি পোস্ট (স্ট্যাটাস) দেয়। সেখানে তিনি লিখেন, “প্রতিনিয়ত চেনা-অচেনা অনেক মানুষ’ই আমার সাথে দেখা করতে আসে ও ছবি তোলার অনুরোধ রাখে। আমি সেটা সম্মানের চোখে দেখি এবং ছবি তুলি, কোন সময় কাউকে না করি না। কিন্তু এই ছবি অপব্যবহার করে কেউ যদি কোন ব্যাবসায়ীক চিন্তাভাবনা রাখে, কোন অপপ্রচারের চিন্তা ভাবনা রাখে, এটার বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব আমার না, তার জন্য দেশের আইন বা প্রশাসন আছে। আমি প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করবো আমার সাথে ছবি তুলে, সে ছবির অপব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা গ্রহনের জন্য। ধন্যবাদ”।

 

এদিকে অয়ন ওসমানের ফেসবুকে এই স্ট্যাটাসের পর এলাকাবাসীর কাছে অপকর্মের আস্তা হিসেবে পরিচিত কার্যালয়টিতে বুধবার (২৭ জুলাই) রাতে তালা ঝুলিয়ে দেয় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ। এ খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্বস্থির নি:শ্বাস ফেলে স্থানীয় লোকজন। তারা পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়েছে।

 

সিদ্ধিরগঞ্জ অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মশিউর রহমান জানান, মাদক ব্যবসায়ি টাইগার ফারুকের অফিসে তালা দিয়েছি। ওই অফিস মুলত মাদকের আস্তানা। সেখানে বসে টাইগার ফারুক মাদক বেচা বিক্রি করে। মাদক ব্যবসায়িদের শেল্টার দেয়। তিনি আরও জানান, টাইগার ফারুকের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। সে অনেক খারাপ লোক। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

স্থানীয়রা জানায়, গভীর রাত পর্যন্ত ওই কার্যালয়ে মাদক কেনা-বেচা ও সেবন চলতো । কখন কিভাবে কোথা থেকে মাদক আসবে এবং সেগুলো কিভাবে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পৌছে দেয়া যায় তার গোপন শলাপরামর্শ হয় ওই কার্যালয়ে। টাকার ভাগবাটোয়ারাও হয় সেখানে। দীর্ঘদিন ধরে এমন কার্যক্রম চলে আসলেও বাইরে থেকে বুঝার উপায় ছিল না। সবাই জানতো এটা যুবলীগের কার্যালয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই কার্যালয়ের ১০ জন সদস্য বিপুল পরিমান মাদক দ্রব্যসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর মাদক ব্যবসার বিষয়টি ফাঁস হয়ে যায়। “কথায় বলে বাইরে ফিটফাট ভেতরে সদর ঘাট”। অথচ গ্রেপ্তারকৃত এই ১০ সদস্যকে টাইগার ফারুক পরিচয় দিত তারা যুবলীগকর্মী। কিন্তু পরে সবাই জানতে পারে তারা যুবলীগের নাম বিক্রি করে মুলত মাদক ব্যবসা করতো। আর টাইগার ফারুক তাদের দিয়ে মাদক ব্যবসা করিয়ে রাতারাতি প্রচুর টাকার মালিক বনে গেছে। ফাউন্ডেশন দিয়ে বহুতল বাড়ি নির্মাণ করেছে। যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, কিভাবে সম্ভব ১-২ বছরে এতো বড় বিল্ডিং বানানো।

 

স্থানীয় এলাকাবাসী জানায়, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি টিসি রোড এলাকায় ইয়াদআলী মেম্বারের পুল সংলগ্ন চান টাওয়ারের পশ্চিমে বিএনপি নেতা হযরত আলীর বাড়ির নিচতলায় নিচ তলায় একটি রুম ভাড়া নিয়ে সেখানে ১নং ওয়ার্ড যুবলীগের প্রধান কার্যালয় বানিয়েছে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ি টাইগার ফারুক। অথচ যুবলীগে তার কোন পদপদবী নাই। এমন কি ১নং ওয়ার্ডে যুবলীগের কোন কমিটিও দেয়া হয়নি। বিএনপি ঘরোয়ানার টাইগার ফারুক নিজেকে যুবলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে কার্যালয়টি গড়ে তলেছে। এবং কার্যালয়ের ভেতরে বঙ্গবন্ধ, প্রধানমন্ত্রী, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি মজিবুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াছিন মিয়া ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের সভাপতি মতিউর রহমান মতির ছবি টানিয়ে রেখেছে। যাতে যে কেউ দেখলে মনে হয় এটা যুবলীগের কার্যালয়। দিনের বেলা অফিসে আড্ডাবাজি হলেও আসল ব্যবসা শুরু হয় সন্ধ্যার পর। যা চলে গভীর রাত পর্যন্ত।

 

তারা আরও জানান, গত বছরের ১০ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত তিন দফায় টাইগার ফারুকের ১০ সহযোগি র‌্যাব-২ ও ৩ এবং কুমিল্লা ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৪৮ কেজি গাঁজা ও ৮৯৬ বোতল ফেনসিডিল। গ্রেপ্তারকৃত আলমগীর হোসেন, মিলন, তার ভায়রা মোঃ মোশারফ হোসেন ও সহযোগী মোঃ মহিন উদ্দিন হোসেন হৃদয়, রাকিব, ওমর, সোলায়মান, ফরহাদ ও অয়ন কারাগারে যায়। মোটা অংকের টাকা খরচ করে তাদের জামিনে বের করে আনে টাইগার ফারুক।

কে এই টাইগার ফারুক

এলাকাবাসীর তথ্যমতে, মো: ফারুক ওরফে টাইগার ফারুক পিতা-আবু সাইদ। বর্তমান ঠিকানা-মিজমিজি পুর্বপাড়া পাগলাবাড়ি এলাকা। তার বাবা আবু সাঈদ আদমজী জুট মিলস জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সহসভাপতি ছিল। চাচা আমির হোসেন ওরফে শুটার আমির ওরফে বন্দুক আমির জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রচার সম্পাদক ছিল। বর্তমানে তার ছোট ভাই জুয়েল রানা নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি। তার বিরুদ্ধে হেফাজতের দুটি মামলাসহ বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। আরেক ভাই জসিম বিএনপিকর্মী। ছিনতাই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে ছিল। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ চেষ্টার মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।

 

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী গিয়াস উদ্দিনের ধানের শীষের নির্বাচন করে টাইগার ফারুক ও তার বাপ চাচারা। আদমজী জুট মিলস চলাকালীন তৎকালীন নিউ কলোনী ১নং নতুন গেইটে আওয়ামীলীগ দলীয় প্রার্থী শামীম ওসমানের নৌকার প্রতীক ভেঙ্গে ফেলে টাইগার ফারুক। এবং ওই নির্বাচনে শামীম ওসমান পরাজিত হওয়ার পর আগুন দিয়ে নৌকার ক্যাম্প জ্বালিয়ে দেয় ফারুক।

 

বিএনপি সরকারের পতনের পর পিঠ বাঁচাতে কৌশলে আওয়ামীলীগের শিবিরে মিশে যায় টাইগার ফারুক। এবং নিজেকে কখনো যুবলীগ নেতা আবার কখনো যুবলীগ কর্মী পরিচয় দেয়। এই সাইনবোর্ড ব্যবহার করে ফারুক মাদক ব্যবসার সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। আদমজী ইপিজেডে ব্যবসার করার অজুহাতে ভেতরে ভেতরে চলে তার মাদক ব্যবসা। যার কারণে রাতরাতি সে অর্ধকোটি টাকা মূল্যের জমি কিনে সেখানে বহুতল বিল্ডিং বানিয়েছে।

 

টাইগার ফারুক সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি টিসি রোডস্থ বৈশাখী কুঞ্জের বিপরীত দিকে বিএনপির হযরত আলীর দোতলা বিল্ডিংয়ের নিচ তলায় যুবলীগের কথিত কার্যালয় বানায়। বর্তমানে ফারুক প্রতবিন্ধী সিরাজ হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলার আসামী। ফারুকের মেঝ ভাই মো: জসিম ছিনতাইয়ের সময় হাতে নাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি হয়। পরে জামিনে বেরিয়ে আসে। এছাড়াও সে ধর্ষণ চেষ্টা মামলার আসামী। এবং চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ি ও ছিনতাইকারী। টাইগার ফারুকের আরেক ছোট ভাই জুয়েল রানা নারায়ণগঞ্জ মহা নগর ছাত্রদলের সহ সভাপতি। সে ২৫ মার্চে হেফাজতের হরতালের দিন নাশকতার ঘটনায় দায়ের করা মামলার মধ্যে একটি মামলায় প্রধান আসামী ও একটি মামলায় ১৯ নাম্বার আসামী। সেও মাদক বিক্রেতা।


এই বিভাগের আরও সংবাদ