1. admin@bangla24bdnews.com : b24bdnews :
  2. robinmzamin@gmail.com : mehrab hossain provat : mehrab hossain provat
  3. maualh4013@gmail.com : md aual hosen : Md. Aual Hosen
  4. tanvirahmedtonmoy1987@gmail.com : shuvo khan : shuvo khan
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন

তরী এবং আমরা

আসিফ হোসাইন: (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ)
  • আপডেট সময় : সোমবার, ৪ মে, ২০২০
  • ২২৭

সারাদেশে প্রতিবছর রক্তের অভাবে ৫৫ হাজার মানুষ মারা যায় (সূত্র: somoynews)। আমি এই মৃত্যুগুলোকে “বিনা চিকিৎসায়” মৃত্যু বলি। হয়তো “বিনা চিকিৎসা” শব্দ দুইটি দৃষ্টিকটু। আসলে বিনা চিকিৎসা বলতে আমরা রক্ত দিতে পারি নি বলে লোকগুলোর মৃত্যু হয়েছে এটা বুঝাচ্ছি।

যাই হোক, আমি নিয়মিত রক্তদাতা। আল্লাহর রহমতে ১০বার দিয়ে ফেলেছি। জীবনে যতদিন বাঁচবো ততদিন মানুষদের এই রক্তিম ভালবাসা দিয়েই যাবো।

আমি শুধু যে রক্ত ডোনেট করি তা না। পাশাপাশি যেকোন রক্তের গ্রুপ মেনেজ করে দেয়ার কাজটিও করি। আপনারা যারা আমাকে খুব কাছ থেকে চিনেন তারা হয়তো জানেন আমি এসব মানবিক কাজগুলো সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করি না। সত্যি কথা বলতে আমি মানবিক যা কিছুই করি না কেন সেটা খুব আড়ালে থেকে। একদম কাছের কিছু মানুষ ছাড়া কাউকে জানাই না। তবুও আল্লাহর রহমতে প্রতিদিন ইনবক্সে রক্তের প্রয়োজনে আমার খোঁজ করে। এই খোঁজ করাটা আমার আত্মায় তৃপ্তি দেয়। আপ্রাণ চেষ্টা করি রক্ত মেনেজ করে দেয়ার।

আমার কাছে কিছু থেলোসোমিয়ার রুগী আছে। যাদের আমি প্রতিমাসে রক্ত মেনেজ করে দেই। আমার কাছে কেউ রক্তের খোঁজ করলে আমি যতটুকু পারি তাদের টেনশন মুক্ত রাখি। সবটা দ্বায়িত্ব আমার কাঁধে নিয়ে রক্ত মেনেজ করে দেই। আল্লাহর রহমতে খুউব কম মানুষই আমার কাছ থেকে রক্ত চেয়ে খালি হাতে ফিরে গেছেন। যাদের কোনভাবেই রক্ত মেনেজ করে দিতে পারি না তাদের যতটুকু কষ্ট হয় তার চেয়ে দ্বিগুন পীড়া দেয় আমার মন।

যাইহোক মূল গল্পে আসি। সবারই একটা নির্দিষ্ট আড্ডা প্লেস থাকে। আমারও ব্যাতিক্রম নয়। আমি প্রতিদিন আড্ডা দিতাম চাষাড়া স্টেশনের সুমন মামার দোকানে। মামার দোকানে কিছু অন্ধ লোক বসে আড্ডা দিত। তারা মূলত ভিক্ষুক। কাজ শেষে মামার দোকানে এসে হিসাবপাতি করতো।
একদিন হঠাৎ সুমন মামা বললো,
– বাজান, আমার দোকানে বসে আড্ডা দেয় সুজনকে চিনো?
আমি বললাম,
– না তো মামা। দেখলে হয়তো চিনবো।
মামা বললো,
– সুজন ভিক্ষা করে। ওর বউটা গর্ভবতী। অনেক অসুস্থ। ডাক্তার বলছে রক্ত লাগবো। তুমি মেনেজ করে দিবা?
আমি সাথে সাথে বললাম,
– অবশ্যই মামা। ডোনার নিয়ে কই যেতে হবে সেটা বলেন?
সুমন মামা অন্ধ সুজন ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিল। আমি পরের দিন ডোনার নিয়ে মুস্তাফিজ সেন্টার ক্লিনিকে চলে গেলাম। সুজন ভাইয়ের স্ত্রীকে দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম। যে কেউ দেখলেই চমকে উঠবে। কন্ডিশন খুবই খারাপ। হাত, পা, মুখ ফুলে অবস্থা খুবই ক্রিটিকাল। আমি সুজন ভাইকে বললাম,
– ডাক্তার আসলে আপনাকে কি বলেছে? ভাবীর অবস্থা তো তেমন ভালো না।
সুজন ভাই বললো,
– আমি তো ভাই ডাক্তারের সাথে তেমন কথা বলি নাই। আপনি একটু কথা বলে দেখেন কি বলে।
আমি সরাসরি ক্লিনিকের কর্তব্যরত চিকিৎসকের কাছে গেলাম। চিকিৎসক সুজন ভাইয়ের স্ত্রীর ফাইলটা দেখে বললো,
– প্যাশেন্ট আপনার কি হয়?
আমি বললাম,
– ভাবী হয়।
চিকিৎসক চোখমুখ শক্ত করে বললো,
– এই প্যাশেন্টকে আমি আরো তিনদিন আগে ঢাকা মেডিকেলে রেফার্ড করেছি। আজকে কেন এখানে নিয়ে আসছেন?
আমি হতবাক হয়ে পড়লাম। আমি আমতা আমতা করে বললাম,
– এখন কি করতে পারি?
চিকিৎসক বললো,
– এই প্যাশেন্ট যেকোন সময় হার্ট এ্যাটাক করে মারা যেতে পারে। রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমান মাত্র ৪। তার উপর প্যাশেন্ট গর্ভবতী।

আমি সুজন ভাই আর ভাবীকে নিয়ে বের হয়ে পড়লাম। তখন রাত আটটা। সুজন ভাইকে বললাম, যত দ্রুত সম্ভব ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে ভর্তি করাতে হবে। ভাবীর মা কিংবা পরিচিত কাউকে নিলে ভাল হতো।
সুজন ভাইয়ের মুখ ছোট হয়ে যায়। আমাকে বললো,
– ভাই কালকে নিয়ে যাই?
আমি বললাম,
– ঠিক আছে। আপনারা রেডি হয়ে আমাকে ফোন দিবেন।

পরেরদিন বিকেলে আমাকে ফোন দিয়ে বললো, ভাই আমরা রেডি।
আমি দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে উনাদের নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের পথে রওনা হলাম। আমার সাথে দুইটা বন্ধুকেও নিয়ে নিলাম। পাশাপাশি আমার ভার্সিটির বন্ধুদের ঢাকা মেডিকেলে আসতে বললাম।
ঢাকা মেডিকেল পৌছে নিয়ে গেলাম পুরাতন ভবনের গাইনি বিভাগে। কর্তব্যরত চিকিৎসক প্যাশেন্ট দেখে বললো কি সমস্যা?
আমরা ক্লিনিকে করা বিভিন্ন পরীক্ষার ফাইল এগিয়ে দিলাম। চিকিৎসক একনজর দেখে ভাবীকে বললো,
– বাচ্চা কতমাসের?
ভাবী বললো,
– আট মাসের একটু কম।
এবার চিকিৎসক আমাদের দিকে তাকিয়ে বললো,
– এক্ষণ এই জায়গা থেকে প্যাশেন্ট বের করেন। এই পেশেন্টের চিকিৎসা এখানে নাই। আর রুগীরে তো অর্ধেক মেরে হাসপাতালে নিয়ে আসছেন।
চিকিৎসককে খুব ঠান্ডা মাথায় সবকিছু বুঝিয়ে বললাম। তিনি এবার একটু নরম হলেন। বললেন, এক কাজ করেন একটা হুইল চেয়ার নিয়ে প্যাশেন্টকে নিয়ে নতুন ভবনের পাঁচ তলায় চলে যান।

আমরা এক মূহুর্তও দেরি না করে নতুন ভবনের পাঁচ তলায় নিয়ে গেলাম।
যেখানে চিকিৎসকরা থাকেন সেখানে গিয়ে তাদের সাথে খুব ইমোশনালি দুই বন্ধু কথা বললাম। চোখ বেয়ে দুই বন্ধুরই পানি পড়ছিল। ডাক্তাররা আমাদের সাপোর্ট করলো। সব লাইন ভেঙে আমাদের প্যাশেন্টকে দ্রুত ভর্তি নিলো। এবং খুব দ্রুত আজকের মধ্যে দুইব্যাগ রক্ত মেনেজ করতে বললো। মাথায় পড়লো বাজ। দ্রুত ভার্সিটির বন্ধুদের ফোন দিলাম। এক বন্ধুকে খুঁজে পেলাম যার রক্তের গ্রুপ ভাবীর রক্তের গ্রুপের সাথে মিলে। বন্ধু তখন পল্টন মোড়ে। শুধু বললাম,
– তুই দ্রুত না আসলে দুইজন মানুষ চোখের সামনে মারা যাবে।
জাষ্ট দশ মিনিটের মধ্যে বন্ধু হাজির। আসলে সবকিছু আল্লাহ নিজ হাতে করে দিচ্ছিলেন মনে হলো। ডোনার নিয়ে দ্রুত ভাবীর দ্বায়িত্ব নেয়া চিকিৎসকের কাছে গেলাম। চিকিৎসক আবার সব কাজ রেখে একটা কাগজের টুকরায় আর্জেন্ট রক্ত দেয়ার কথাটি লিখে দিয়ে ব্লাড ব্যাংকে পাঠালো। সেখানেও সবকিছু দ্রুত মেনেজ করলাম। মাত্র ত্রিশ মিনিটের মধ্যে রক্ত নিয়ে চিকিৎসকের কাছে হাজির হলাম। চিকিৎসকটি আমাদের এত অস্থিরতা দেখে অনেক সাধুবাদ দিলেন। সরাসরি বললেন,
– মনে হচ্ছে তোমাদের সাথে এই প্যাশেন্টের রক্তের সম্পর্ক আছে। সবসময় এভাবেই অসহায় মানুষদের সাহায্য করে যাবে। আমরা মৃদু হেসে বললাম, দোয়া করবেন আমাদের জন্য।
সবথেকে অবাক করা ব্যাপার হলো, ভাবীকে রাখা ওয়ার্ডটিতে তিনজন চিকিৎসক ছিলেন। তারা সবাই যেন আমাদের সাথে ভাবীকে বাঁচানোর জন্য উঠে পড়ে লাগলেন।

সেদিন মেডিকেলের এই মাথা থেকে ঐ মাথা দৌড়াতে দৌড়াতে পা আর চলে না। যখন বিদায় নিবো তখন রাত একটা। সুজন ভাইকে বললাম ভাই শুধু রাতটা! আবার কালকেই এসে পড়বো। কোন টেনশন নিয়েন না।

পরের দিন আবার গেলাম হাসপাতালে। এবার সাথে করে ডোনার নিয়ে গেলাম। রক্ত নিয়ে আবার রুগীর শরীরে পুশ করলো। চিকিৎসক জানালো,
প্রায় ১০ ব্যাগের মতো রক্ত লাগতে পারে। প্রতিদিন এক ব্যাগ করে দিলেই হবে।

এরপরের দিন থেকে আমি একদিন যাই নয়তো অন্য বন্ধু একদিন যায়। আমার স্পষ্ট মনে আছে ভাবীকে রক্ত দেয়ার জন্য নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের চিটাগাং রোড থেকে ডোনার এসেও রক্ত দিয়ে গেছেন।

আস্তে আস্তে ভাবী সুস্থ হওয়ার পথে। এই কয়দিনে কেমন যেন আপন হয়ে গেছি আমরা সবাই। চিকিৎসকরা আামাদের দেখে কুশল বিনিময় করেন। সবার নাম্বার পর্যন্ত আমাদের থেকে রেখে দিলেন সব চিকিৎসকরা। আমরা চিকিৎসকদের কাছ থেকে ফোন দিয়েও মাঝেমাঝে জিজ্ঞেস করেছি প্যাশেন্টের অবস্থা এখন কেমন.. সোজাকথা সবকিছু হয়েছে আল্লাহর ইচ্ছায়।

হাসপাতালে ভর্তির ১৭দিনের মাথায় চিকিৎসকরা ভাবীকে সিজার করে তৃতীয় কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। সেদিন আমি যেতে পারি নি। আমার এক বন্ধু ছিল সেদিন হাসপাতালে। বিকেল দিকে আমার নাম্বারে সুজন ভাই ফোন দেয়। আমি ফোন রিসিভ করে বললাম,
– ভাই ভাবীর কি অবস্থা?
ফোনের ওপাশ থেকে ভাবী বললো,
– ভাই আমি ভালো আছি। আপনি আসবেন না আজকে? আমার মেয়ে হইছে।

আমি খুব আবেগআপ্লুত হয়ে পড়লাম। দুফোটা চোখের পানি গড়িয়ে পড়লো খুশিতে। আমি ভাঙা গলায় বললাম,
– আলহামদুলিল্লাহ। আমি কালকেই আসবো ভাবী।
ওপাশ থেকে ভাবী বললো,
– ভাই একটা কথা, আমার মেয়েটার নাম কিন্তু আপনি রাখবেন। আপনি যে নাম রাখবেন সে নামেই আমার মেয়েকে আমি ডাকবো।

আমি ভাষা হারিয়ে ফেললাম। খুব নরম গলায় বললাম, – আচ্ছা।

কাহিনী এতটুকুই। আজকে কেন জানি মনে হলো এই ঘটনাটা আপনাদের জানাই তাই লিখলাম। ও হ্যা ভাবীর মেয়ের নাম রেখেছিলাম “তরী”। সবাই ওকে তরী বলেই ডাকে।

 

আসিফ হোসাইন

ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

asifhossain2588@gmail.com

ফেসবুকে আমরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ বিভাগের আরও সংবাদ
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব www.bangla24bdnews.com কর্তৃক সংরক্ষিত
Customized By NewsSmart