1. admin@bangla24bdnews.com : b24bdnews :
  2. robinmzamin@gmail.com : mehrab hossain provat : mehrab hossain provat
  3. maualh4013@gmail.com : md aual hosen : Md. Aual Hosen
  4. tanvirahmedtonmoy1987@gmail.com : shuvo khan : shuvo khan
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ০৮:৩৮ পূর্বাহ্ন

লাঞ্চ ।। খাদেমুল ইসলাম

অনুবাদ: আব্দুল্লাহ আল মাসুদ (বাংলা ২৪ বিডি নিউজ):
  • আপডেট সময় : বুধবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯
  • ৩১৭

‘লাঞ্চ’ ডিক্লেয়ার করেই আম্পায়ার উইকেট থেকে একটা বেল মাটিতে ফেলে দিলো। ব্যাটসম্যান, ফিল্ডিং-টিম এবং আম্পায়ার সবাই মাঠ ছেড়ে গ্যালারির দিকে যায়।

ফরিদ একটু মনমরা হয়ে পিছন-পিছন হাঁটছিলো। কারণ সে একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ মিস করেছে। রক্ষী বাহিনীর একটা গাড়ি লেগসাইড বাউন্ডারিতে দাঁড়ানো ফরিদের মনোযোগ ব্যাহত করেছিলো। গাড়িটা বাউন্ডারি দেয়ালের এত কাছে দিয়ে যাচ্ছিল যে, এর অর্ধেকটা ছাদ দেখা যাচ্ছিল। এমনকি পিকক্যাপ-এর নীচে ক্রিকেটারদের দিকে তাকিয়ে থাকা লোকগুলোর উৎসুক মুখ দেখা যাচ্ছিল। কঠোর মুখগুলোর বেশিরভাগই সবেমাত্র গ্রাম থেকে আসা, এবং যুদ্ধ বা গোলাবারুদের তাণ্ডবের জন্য বেমানান। আসলে বল যখন খুব উঁচু থেকে তার দিকেই আসছে তখনও সে ঐ লোকগুলোর কথাই ভাবছে, আর এজন্যেই তার দেরি হয়ে গেল। চারপাশে ‘ক্যাচ ইট! ক্যাচ ইট!’—চিৎকারের মধ্যে বলটা হাতটাকে আলতো ছুঁয়ে মাটিতে পড়ে গেল। মাটি থেকে বলটা কুড়িয়ে উইকেট কিপারের দিকে ছুঁড়ে মারার পর সে দেখে ট্রাক চলে গেছে।

সময়টা ১৯৭৩ সালের নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্বিভাগ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের মধ্যমরশুম। ফরিদের ডিপার্টমেন্ট এবং জিওগ্রাফি ডিপার্টমেন্ট-এর মধ্যে আজকের ম্যাচটি বাতিল করেছে কর্তৃপক্ষ। জিওগ্রাফির একটা ছেলে ক্লাস ট্রিপে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা গেছে। ফরিদের টিমের সবাই মাঠে আসার পর এই খবর, খেলা হবে না।

ছেলেগুলো হতাশ হয়ে একটু ঘোরাঘুরি করছে, এমন সময় ফরিদের টিম ক্যাপ্টেনের চোখ পড়ল ইকোনোমিক্সের মোমিনের উপর, যে কিনা একটু সকাল সকাল খেলা দেখতে চলে এসেছিলো। সে তাকে একটা তাৎক্ষণিক ম্যাচের প্রস্তাব দিলে মোমিন রাজি হয়ে যায়। মাঠে যারা খেলা দেখতে এসেছে তাদেরকে নিয়ে মোটামুটি একটা টিম দাঁড় করিয়ে ফেলে সে। ইতিহাস বিভাগের পেস বোলার শাহীনকে দলে নিতে পেরে ভাগ্য আরো খোলে। শাহীন আবার ওয়ান্ডারার্সের খেলোয়াড়। আউটার স্টেডিয়ামে সিজনের লীগ ম্যাচ খেলে—বিভাগীয় ক্রিকেটে প্রতিপক্ষের আতঙ্কস্বরূপ সে।

এরই মধ্যে পরিপাটি দাড়ি কামানো, মুখে চিকন গোঁফের রেখা, সহকারী খেলা পরিচালক এসে হাজির। তার কাছে অনুরোধ করতেই তিনি সানন্দে রাজি হয়ে যান। আর দেরি না করে মোমিনসহ সবাইকে আধঘণ্টার মধ্যে সাদা ক্রিকেট ড্রেস পরে আসতে বলেন। তার হাততালির ভঙ্গিমা এমনই যে, পারলে উড়ে চলে আসতে হবে।

আজকের দিনটা ক্রিকেটেরই দিন। ঠান্ডা-ঠান্ডা, আলো-ঝলমল। মাঠের কিনারায় নারকেল গাছগুলোর ওপর কুয়াশার চাদর অনেকটাই হালকা হয়ে গিয়েছে। এরই মধ্যে ফরিদের ডিপার্টমেন্টের বেশ কয়েকজন প্যাভেলিয়ানের বাম পাশটি দখল করে বসে পড়ে। ফরিদ এই প্রাকটিস ম্যাচগুলো উপভোগ করে। কেন না, এতে কোনো টেনশন নেই। সবাই মিলে হৈ-হুল্লোড়, ঠাট্টা-ইয়ার্কি, প্র্যাকটিস, ক্যাচ, ব্যাট, গ্লাভস, প্যাড, স্টাম্পে টইটুম্বুর তোবড়ানো গ্রাম্য টিনের ট্রাংক ঘাঁটাঘাঁটি।

‘টসে জিতলে ফিল্ডিং নেবো। পিচ এখনো ভেজা। শাহীনের বল বেশি সুইং করবে।’ ফরিদের ক্যাপ্টেন মাঠে টস করতে যাওয়ার আগেই বলল। কয়েনটা বাতাসে ঘুরপাক খেতে খেতে মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই ফরিদের ক্যাপ্টেন উল্টো ঘুরে টিমমেটদের ভি সাইন দেখালো। টসে জিতেছে! ফিল্ডিং!

ক্লাসমেটদের দলে শুরুতে সে ছিলো না। স্যান্ডেলের ফিতা ছিড়ে যাওয়ার জন্য সকালের দিকে মাঠে না গিয়ে বাসায় চলে গিয়েছিল বদলানোর জন্য। গ্যালারি খুব তাড়াতাড়ি ভরে গেল, কারণ ৮:২০ থেকে ৯:২০-এর ক্লাস শেষে ছেলেমেয়েরা তাদের নিজ নিজ ডিপার্টমেন্টকে উৎসাহ দিতে মাঠে চলে এসেছে। এরই মধ্যে গ্যালারির একেবারে উপরের সিঁড়িতে শুয়ে থাকা ছিন্নমূল মানুষগুলোর আড়মোড়া ভাঙে। বন্ধুদের সঙ্গে জ্বলজ্বলে হলুদের মধ্যে চিকন সবুজ ডোরার শাড়ি পরে থাকা সুলতানাকে চোখে পড়ে ফরিদের।

গ্যালারির একটা দিকে চেঁচামেচি একটু বেশি। পান-বিড়িওয়ালা মাঠের কোনায় আস্তানা গেড়েছে, বাদাম এবং মুড়িওয়ালারা ভালোই ব্যবসা করছে। কিছু ছোটো ছোটো ছেলেপেলে তাদের সঙ্গে গোল হয়ে বসে মজা করছে। ফরিদ সিঁড়ির কয়েক ধাপ ওপরে উঠে সুলতানার কাছে গিয়ে বসে। ঘন কোঁকড়ানো কালো চুল, ধারালো চিবুক, চোখ দুটো যেন সারা মাঠ জুড়ে নাচছে। ওখানেই পড়া বড় খালাত বোনের কাছে শেখা শান্তিনিকেতনী ঢঙে শাড়ি পরেছে।

সুলতানা তার দিকে তাকিয়ে হাসে। ফরিদ পাশে বসতে বসতে বলে, ‘তুমি এখানে খালি পায়ে হাঁটলেই তো পারতে।’

‘হ্যাঁ, পারতাম।’

‘তুমি কি আমার ক্যাচ মিস করা দেখেছ?’

‘দেখলাম।’ এবং হেসে বলে, ‘আমরা সবাই দেখলাম তুমি অন্য দিকে তাকিয়ে আছো।’

‘শালার রক্ষীবাহিনী, তখনই এলো।’

কল্পনা তাদের পাশে বসেছিলো, সেও জোরে হেসে ফেলে। এর মধ্যে ফরিদের চোখ পড়ল তার দুই ক্লাসমেট বাদামি কাগজের প্যাকেট আর কোকের বোতলের ক্রেট নামাচ্ছে রিকশা থেকে। শাহবাগ থেকে লাঞ্চের জন্য বার্গার কেনা হয়েছে।

সবুজ-সোনালি স্যান্ডেলে-মোড়া নিজের পা’টা বাড়িয়ে দিয়ে সুলতানা জিজ্ঞাস করল, ‘কেমন হয়েছে এটা?’

‘চমৎকার।’

‘গত সপ্তায় কিনেছি।’

খালি পিচের উপর মরীচিকা খেলা করছে আর একটু বাতাসে পামগাছগুলোর ছোট-বড় আঙুলের মতো পাতা মৃদু মৃদু নড়ছে। বাউন্ডারি ওয়ালের পিছন দিয়ে একটা বা দু’টা গাড়ি টিএসসির গোল চত্বরে বাঁক নিচ্ছে। ফরিদের ক্যাপ্টেন হাতে কাগজ কলম নিয়ে তার সামনে এসে বলে, ‘ফরিদ, তোকে চার নাম্বারে ব্যাটিং-এ নামাচ্ছি, ঠিক আছে?’ ফরিদ আবারো কাগজের ব্যাগগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবে, এই শুকনা বনরুটি তার ভিতর আরো শুকনা মাংসের কিমা, এ কোক দিয়ে গিলে না খেলে গলা দিয়ে নামবে না। সে বলে, ‘আমার এই বার্গার খেতে ভালো লাগে না।’ সুলতানা বলে, ‘চল, তুলির ওখানে যাই। ওর ওখানে সবসময়ই কিছু-না কিছু খাবার পাওয়া যায়।’ তুলি সুলতানার আপন ফুপু।

‘সেই মগবাজার যেতে হবে?’

‘আমার সঙ্গে গাড়ি আছে। খেলা শুরু হওয়ার আগেই চলে আসব,’ সুলতানা বলে। তার চোখে আলো নাচে। সৌন্দর্য পৃথিবীতে সবচেয়ে রহস্যময়। এর থাকার কোনো কারণ ছিল না, তবু ঐ তো ছিল, গনগনে, এই জ্বলে উঠছে সবকিছুকে চমকে দিয়ে, আবার এই নিভে যাচ্ছে কোথায়, কোনো নোংরা গলিতে।

‘চল যাই,’ অধৈর্য সুলতানা বলে। বাসাটা মগবাজারের এক ঘুরপার গলির ভিতর। এখানেই, মাত্র সপ্তা-দুয়েক আগে, সবুজ ঝরকাকাটা বাগানের ঘেরে, সন্ধ্যা ঝরে পড়ছে যখন প্যাঁচানো মাধবীতে, সুলতানা তার বাহু ধরে টান দিয়ে তাকে চুমু খেয়েছিলো। চোখ বন্ধ, ঠোঁট খোলা। উঠানের ওপারে সদর দরজার বাইরে রিকশার ক্রিংকার। সে অনুভব করেছিল সুলতানার অনিন্দ্য শরীরকে গলে তরল হয়ে যেতে, এক মোহন মাদকতায়, আর্দ্রতায় ভরে যেতে।

নীচে নেমে সোজা ক্যাপ্টেনের কাছে গিয়ে ফরিদ বলল, ‘আমরা বাইরে লাঞ্চ করতে যাচ্ছি।’

‘কেনো? আমরা তো সবার জন্য লাঞ্চ এনেছি,’ সুলতানার দিকে তাকিয়ে ক্যাপ্টেন জিজ্ঞেস করল।

‘না, তা না, আমরা অন্য কোথাও লাঞ্চ করব,’ গালে টোল ফেলে সুলতানা বলল তাকে।

‘ঠিক আছে, কিন্তু ঠিক দু’টার মধ্যে খেলা শুরু হবে, দেরি করবে না।’

‘আমরা তার আগেই চলে আসবো।’

রক্ষীবাহিনী আকাশ থেকে নাজেল হয়েছে যেন। হাওয়ায় বিপদের গন্ধ, রাস্তায় গোলমাল: গোলাগুলি, হাইজ্যাকিং, সাংসদ খুন, স্মাগলিং আর হঠাৎ বড়লোক হওয়ার নানা খবর। বিশাল সব রাজনৈতিক মিছিল আর সমাবেশ। লিফলেট আর বন্দুক। চরমপন্থীদের, গাঁয়ে-গঞ্জে যুদ্ধ ঘোষণার সংবাদ। সরকারের জবাব, রক্ষীবাহিনী। মধ্যরাতে দরজায় কড়ানাড়া আর নদীদের রক্তাক্ত হওয়ার গল্প, ভিন্নমতাবলম্বী শিকারের গল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিয়ন অফিসে, সরকারি দলের ছাত্রনেতাদের আড়মোড়া ভাঙা আর অগণিত চায়ের অর্ডার। বর্ষার বৃষ্টি যখন আছড়ে পড়ছে ক্লাসরুমের জানালায়, করিডোর জুড়ে উন্মত্ত প্রতিবাদ আর প্রতি-প্রতিবাদে কার সাধ্য ক্লাসের লেকচার শোনে। ক্যাম্পাসের আশেপাশের রাস্তায় ট্রাক-বোঝাই কঠিন মুখগুলো জলকাদায় ঘোরাফেরা করছে। সতর্ক, অবিচল।

কাঠের ছোট গেটের সামনে গাড়ি থেকে তারা দুজন নামে। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে চলে যায় গলির কোনায় পার্ক করতে। দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে ভিতরের গোলাপি-শাদা নয়নতারা-ঘেরা ইটের পথে হাঁটতে হাঁটতে সুলতানা বলল, ‘চল, পাশের ছোট দরজা দিয়ে ঢুকি।’ সবুজ রঙের পুরানো দু’পাল্লার দরজায় জোরে টোকা দিতে দিতে সুলতানা কাজের ছেলেটাকে ডাকল, ‘কালাম কালাম’, দরজাটি ভিতর থেকে কাঠের গুঁড়ি দিয়ে বন্ধ করা। ভিতর থেকে কালামের দৌড়ে আসার শব্দ পাওয়া গেল এবং দরজা খুলে গেল। তাগড়া এক কিশোর এই কালাম।

সুলতানা জিজ্ঞাস করে, ‘কিরে,’ ভেতর ঢুকতে ঢুকতে বলে, ‘তুলি কি বাসায়?’

‘না, ব্যাংকে গেছে।’

বাসাটা আসলে তার বাবার। বাবা তার একমাত্র বোনকে দিয়ে দিয়েছে। ১৯৭১-এর জুন মাসে ফুপুর স্বামীকে রাজাকারেরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল। আর ফিরে আসেনি।

‘আমাদের তাড়াতাড়ি খাবার দিতে পারবি?’

‘পারুম, কালকা রাতের মুরগির মাংস আছে, শুধু ভাত চড়াইলেই হইব।’

‘তাড়াতাড়ি কর, আমাদের আবার ফিরে যেতে হবে।’ খুব তড়িঘড়ি নির্দেশ দিয়েই সে আর কালাম অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়।

ঘরটা খুব সাধারণ, ছিমছাম গোছানো। লাল সিমেন্টের মেঝেয় হালকা ফাটলগুলো নদীর মতো এঁকেবেঁকে যেন সমুদ্রে চলে গেছে। ছোট্ট বিছানা। ম্যাট্রেসের ওপর মলিন একটা চাদর বিছানো, একটা আলনা, ছোট পাটের কার্পেটের উপর একটা হারমনিয়াম আর কতগুলো গানের খাতা পড়ে আছে। জুতা খুলে পায়ের নীচে ঠান্ডা মেঝে পার হয়ে ফরিদ বিছানায় ওঠে। এই পাশের দরজাটি দিয়েই আর্মি ঢুকেছিল, ঐ উঠানটি দিয়েই টেনে নিয়ে গিয়েছিল ফুপাকে।

ধোপ-ধোওয়া আর নানা জায়গায় কোঁচকানো বিছানার চাদরের ওপর ফরিদ আড়মোড়া ভেঙে শুয়ে পড়ে, তার নজর পড়ে জানালার ওপর চারকোনা ফ্রেমে বাঁধানো একটা ছবির দিকে। সেদিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে সে ভাবে ফিল্ডিং করা একটা দুরূহ কাজ। সবসময় একটা ধুকধুকানি, ব্যাটসম্যান ব্যাট ঘোরায় আর বলের পিছনে ছুটতে হয় ফিল্ডারকে, বল আবার মাঠের মধ্যে গড়াতে গড়াতে লাফিয়ে ওঠে কখনও, গুরুত্বর্পূন ক্যাচ মিস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যুদ্ধ শেষ, তারপরও প্রতিদিন মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে বা মারা যাচ্ছে। কারও প্রতিজ্ঞাই রক্ষিত হয়নি। বিশেষ করে মানবমুক্তির প্রতিশ্রুতি।

সুলতানা ঘরে ঢুকে তার সবুজ স্যান্ডলটা পা থেকে ঝেড়ে ফেলে বলে, ‘ভাত এখনই হয়ে যাবে।’

‘ঠিক আছে।’

সুলতানা ফরিদের পাশে শুয়ে পড়ে।

‘তুমি কি দরজা লাগিয়েছ?’ ফরিদ জিজ্ঞাসা করে।

‘না, তুমি করো।’

‘কিন্তু ওটা তোমার দিকে।’

‘তাতে কী।’

নাটকীয়ভাবে ফরিদ বিছানা ছেড়ে উঠতে যেতেই সুলতানা তাকে টান দিয়ে কাছে নিয়ে আসে। ঘন কোঁকড়া চুলের গভীরে নাক ডোবায় ফরিদ। এক হাতে সুলতানার বুকে মৃদু চাপ দেয়। অস্ফুট এক সমর্পণসূচক গুঞ্জন, আর তার পর ধাক্কা দিয়ে ফরিদকে সরিয়ে দিয়ে ঢিলা হলুদ এক বৃষ্টির মতো কাপড়ে চলে যায় দরজায়, বন্ধ করে দেয় সেটা। ফিরে এসে বিছানার এক পাশে বসে, ফরিদের দিকে তাকায়, আর ধীরে ধীরে ওর জামার বোতামগুলি খুলতে খুলতে তার কানে ফিসফিসায়, ‘মুরগিটা খুব ঝাল, সামলাতে পারবে তো?’

‘কোনো সমস্যাই নাই।’

ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি হাঁকিয়ে সময়মতোই তারা মাঠে ফিরে আসে। আম্পায়ারেরা মাঠের দিকে যায়, বেলগুলো আবার স্টাম্পের উপর বসানো হয়। তারা ক্লাসমেটদের সঙ্গে বসবার সময় কল্পনা অর্থপূর্ণ চাউনি দেয় তাদের দিকে। চুমু আর জড়াজড়ির ভাঁজগুলো কাপড় থেকে যত্ন করে মুছে ফেললেও সুলতানার চোখ থেকে অলস আর অসহায় মিটিমিটি আর মুখের বাড়তি রক্তাভ আভা মুছবে কে।

চারদিকের হাততালি আর হৈ-হৈয়ের মধ্যে ব্যাটসম্যানরা মাঠের দিকে যায়। ফরিদের ক্যাপ্টেন ওপেনিং ব্যাটসম্যান। শাহীন ধৈর্যভরে অপেক্ষা করছে তার বোলিং মার্কে, লাল ঝলকানো বলটা দুই হাতে লোফালুফি করতে করতে। চারদিকে দেখে নেয় ক্যাপ্টেন। কিপার, তিনজন স্লিপ আর অফসাইড ফিল্ড সেটিং। আম্পার হাত নামাতেই শাহীন তার দৌড় শুরু করে আর তারপর যেই না বলটা ছুঁড়েছে, তার ডান হাতের ভাজকরা শার্ট খুলে যায়। প্রথম বলটিই ছিল অবিশ্বাস্য, কম লেন্থের, ঝাঁৎ করে লাফিয়ে উঠে বাগানো ব্যাটকে ফাঁকি দিয়ে কিপারের হাতে। স্লিপের তিনজন হাত তুলে লাফিয়ে উঠলেও, অ্যাপিল করল না। ‘ওওওওওহ্!!!…’ হতাশার আওয়াজ ওঠে দর্শকদের মধ্যে।

ফলো-থ্রু শেষ করে শাহীন তার মার্কে ফিরে যাবার সময় ব্যাটসম্যানের দিকে এক ধমকানো চাউনি দিয়ে যায়। তার হাঁটার মধ্যেও এক স্পষ্ট হামবড়াভাব।

ফরিদ গ্যালারিতে বসেই পকেট থেকে সিগারেট বের করে, যেটা কিছুক্ষণ আগে সে কিনেছে পান-বিড়িওয়ালার কাছ থেকে। সামনের সারিতে বসা জাভেদের কাছ থেকে ম্যাচ নিয়ে সিগারেট ধরায়। সিস্টেম তোমাকে হারিয়ে দেয়ই শেষতক। লম্বা একটা টান দেয় ফরিদ। যা-ই করো, এর থেকে বাঁচা নাই তোমার। এ তোমাকে ধরবেই শেষমেষ। যে কোনো দিন তুমি গায়েব হয়ে যাবে, এবং ফিরবে না আর।

ধোঁয়ার প্রথম কুণ্ডলীটা ছুঁড়ে তাকে দীপ্ত হাওয়ায় ঘুরতে দেখে ফরিদ। টারগেট ১১৮ রান। স্কোর বোর্ড-এ শূন্য। গ্যালারির ধাপে হেলান দিয়ে বসে মনোযোগ দিয়ে দেখে ক্রিকেট মাঠে সাজানো মানুষগুলোকে।

মাঠে খেলা শুরু হয়েছে আবার, দস্তুরমতো।

ফেসবুকে আমরা

এ বিভাগের আরও সংবাদ
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব www.bangla24bdnews.com কর্তৃক সংরক্ষিত
Customized By NewsSmart